যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার চার দিনের ভারত সফর শেষ করে ফিরে গেলেও এ নিয়ে আলোচনা থামছে না। ভারত সফরের একাধিক মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
এই তালিকায় যেমন তাজমহলের সামনে তার ছবিকে কেন্দ্র করে ইরানের কর্মকর্তাদের 'কটাক্ষ' রয়েছে, তেমনি রয়েছে জয়পুর থেকে রুবিওর বিদায়ের সময় ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি।
আগ্রার তাজমহলের সামনে রুবিও ও তার স্ত্রী ছবি তুলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের তীব্র সংঘাতের আবহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ছবি ঘিরে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি হায়দ্রাবাদে ইরানি কনস্যুলেট। সামাজিক মাধ্যমে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে লেখা হয়-‘রুবিও যদি এর ইতিহাস বা স্থাপত্য সম্পর্কে জানতেন, তাহলে তিনি এখানে ছবি তোলার জন্য পোজ দিতেন না।’
অন্যদিকে মার্কো রুবিও যখন রাজস্থানের জয়পুর থেকে রওনা দেন, তখন তাকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে কোনো বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ বা ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন না, যা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই অভ্যর্থনা বা বিদায়সংক্রান্ত প্রোটোকল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী মার্কো রুবিওর জয়পুর সফর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না।
তার জয়পুর ও আগ্রা সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন। প্রটোকল অনুযায়ী এই জাতীয় সফরের সময় মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিত থাকার প্রয়োজন হয় না। তবে ঘটনাকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে।
শেষপাল বৈদ্য নামের এক ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘মোদি সরকার বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির তৃতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচিত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মর্যাদাকে একজন থানার এসএইচওর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। এর আগে অন্তত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এমন অশালীন আচরণ আমি দেখিনি। ট্রাম্পের 'হেলহোল' মন্তব্যের এটা কেমন জবাব?’
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এপ্রিল মাসে ভারত সম্পর্কে রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাইকেল অ্যালান ওয়াইনারের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে ট্রুথ সোশ্যালে রিপোস্ট করেছিলেন। ওয়াইনার তার রেডিও শো দ্য স্যাভেজ নেশনের জন্যও জনপ্রিয়।
ওয়াইনার যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ভারত সম্পর্কে 'হেল হোল' (নরকতুল্য বোঝাতে) শব্দ ব্যবহার করেন। ট্রাম্প ওই পোস্ট শেয়ার করার পর বিতর্ক বাড়ে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়।
মার্কো রুবিওর ভারত সফরের সময় এক সাংবাদিক তাকে এ নিয়ে প্রশ্নও করে বসেন। বিষয়টা রুবিওকে 'অস্বস্তিতে' ফেলেছিল। তার জবাব ঘিরেও অবশ্য কম আলোচনা হয়নি।
জয়পুরে রুবিওর বিদায়ের সময় যে চিত্র দেখা গেছে, তাকে অনেকেই 'হেল হোল' মন্তব্যের প্রেক্ষিতে দেওয়া ভারতের 'জবাব' বলে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন প্রবীণ আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ অভিষেক সিংভি লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারতের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করে, তাহলে তার বিনিময়ে লাল গালিচার কূটনীতি আশা করা উচিত নয়।’
‘মার্কো রুবিওর জন্য তুলনামূলকভাবে নিম্ন-স্তরের এই প্রোটোকল এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টা পারস্পরিক সম্মানের এবং ভারত নিজেকে ক্লায়েন্ট স্টেট হিসাবে নয়, বরং সমান অংশীদার হিসেবে দেখে।’
গণেশ নামে এক জনৈক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, ‘বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি মার্কো রুবিওকে জয়পুর থেকে বিদায় জানাতে শুধু এসএইচও, কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর এবং কয়েকজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কোনো মন্ত্রী পর্যায়ের কেউ আসেননি। একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার প্রতি এটা এযাবৎকালের অন্যতম শীতলতম অভ্যর্থনা বলে মনে করা হচ্ছে।’
সলিল মাথুর নামে আরেক ব্যক্তি মনে করেন রুবিওকে বিদায় জানানোর সময় যে দৃশ্য চোখে পড়েছে, তার নেপথ্যে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে 'বার্তা দেওয়া'।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যদিও এই প্রোটোকল আপাতদৃষ্টিতে যথাযথ, তবে মার্কো রুবিওর অভ্যর্থনা কিছুটা হলেও শীতল মনে হয়েছে। আমার মতে, আমেরিকাকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে সেটা যথার্থ।’
তবে এহেন আচরণের সমালোচনাও করেছেন অনেকে। সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুশীল সিং শেভরন লিখেছেন, ‘মার্কো রুবিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাকে বিদায় জানাতে উর্দিধারীদের মোতায়েন করার এই অমার্জিত আচরণ ভারতীয় বাহিনীর ভাবমূর্তির পক্ষে ভালো নয়। আপনারা যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে সন্তুষ্ট নাও হতে পারেন। কিন্তু তাই বলে বিশ্বের সামনে এইভাবে উপস্থাপনা করা উচিত নয়।’
'সংবিধানিক ডকেইত' নামে একটা অ্যাকাউন্ট চালান শিভম নামে একজন ব্যক্তি। তিনি এই সফর প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, ‘ন্যূনতম কূটনৈতিক প্রোটোকল বজায় রাখা হয়েছিল, কিন্তু কোনো অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা বা উষ্ণতা দেখানো হয়নি। উপরন্তু, রুবিওকে ৪৫ ডিগ্রির তীব্র গরম অনুভব করতে হয়েছিল।’
‘কোন ভিত্তিতে আগ্রার কর্মসূচি সকাল ১১টা ৩০মিনিটে এবং জয়পুরের কর্মসূচি দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে নির্ধারিত করা হয়েছিল? তাকে হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে।’
অবিনাশ শিশু নামের আরেক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন কিছু একটা ঘটেছে যা প্রকাশ্যে আসেনি। না হলে মার্কো রুবিওকে এমন শীতল অভ্যর্থনার মুখোমুখি হতে হতো না। আসিম মুনির সফরে এলেও হয়ত তাকে এরচেয়ে ভালোভাবে স্বাগত জানানো হতো।’
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে বুঝিয়েছেন তিনি।
নেড ডোনোভান নামে একটা অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারী ব্যক্তি আবার লিখেছেন, ‘নিকটবর্তী থানার সাব-ইন্সপেক্টরকে দিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক বিদায় দেওয়াটা নিঃসন্দেহে উচ্চ পর্যায়ের ভারতীয় রীতি।’
তাজমহল সফর নিয়ে ইরানের কটাক্ষ
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরের সময় আগ্রার তাজমহল পরিদর্শন করেন। তাজমহলের সামনে স্ত্রীর সঙ্গে ছবিও তুলেছিলেন তিনি। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন রুবিও। হায়দ্রাবাদে ইরানি কনস্যুলেটের তরফে এই ছবি নিয়ে কটাক্ষ করা হয়।
ইরানের কনস্যুলেট সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করা বিবৃতির মাধ্যমে রুবিওকে 'স্মরণ' করিয়ে দেয় তাজমহল ইরানি বংশোদ্ভূত মমতাজের প্রতি মুঘল সম্রাটের ভালোবাসার স্মৃতিসৌধ এবং এর নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন পারস্যের দক্ষ স্থপতিরা।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সেদিকে ইঙ্গিত করে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে ওয়াশিংটনের সমালোচনা করা হয়।
ইরানের কনস্যুলেটের মতে, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সভ্যতা 'নিশ্চিহ্ন' করতে চাইছে। আর অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা ভিন্ন দেশে গিয়ে সেই সভ্যতার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রশংসা করছেন। এই 'দ্বৈত অবস্থানের' কড়া সমালোচনা করে হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ইরানি কনস্যুলেট।
এই মন্তব্য বিষয়টাকে শুধু ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি তারা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির রঙেও রাঙিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের মাঝে দুই পক্ষই প্রায়শই একে অন্যের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া প্রতিক্রিয়া দেয়, সমালোচনা করে।
ইরানি কনস্যুলেটের ওই পাল্টা পোস্ট ক্রমে ভাইরাল হয়ে যায়। একে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে। একদিকে যেমন কেউ কেউ কিছু মার্কো রুবিওকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ঐতিহাসিক পটভূমি না বুঝে যেকোনো জায়গায় ছবি তোলা ঠিক নয়, কেউ কেউ আবার বিষয়টাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে একে ‘কূটনৈতিক প্রতীক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইরানের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে রিজওয়ান শাহ নামের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন,‘মার্কো রুবিও যদি স্মৃতিসৌধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতেন, তাহলে তিনি সম্ভবত এখানে ছবি তুলতেন না।’
‘পারস্যের স্থপতিরা একজন ইরানি রানীর জন্য এই ভবন নির্মাণ করেছিলেন এবং এটা এমন এক সভ্যতার প্রতীক যাকে তাদের (মার্কিন) প্রশাসন বিপন্ন করে তুলেছে এবং (মার্কিন প্রশাসন এর প্রতি) সম্মানও দেখায় না।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম