পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার ক্ষমতায় আসার পর গবাদি পশু জবাইয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় গরুর মাংসের সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে দাম। ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিস্থিতির কারণে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
গত মে মাসে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে বিজেপি সরকার। ক্ষমতায় আসার মাত্র চার দিনের মাথায়, ১৩ মে রাজ্যে গবাদি পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়। এতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো গবাদি পশু জবাইয়ের আগে তার ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা উপযুক্ততার সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। ১৪ বছরের বেশি বয়সী এবং বার্ধক্য, আঘাত বা রোগের কারণে স্থায়ীভাবে কাজের অযোগ্য পশুকেই নির্দিষ্ট শর্তে এই সনদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জবাইও করতে হবে নির্ধারিত কসাইখানায়।
বন্ধ ট্যাংরার কসাইখানা
নতুন বিধিনিষেধের পর কলকাতার ট্যাংরায় থাকা একমাত্র পুরসভা-চালিত কসাইখানাটি তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে শহরে গরুর মাংসের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাংস বিক্রেতাদের লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা। গত জুনে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের পর পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ায় অনেক বিক্রেতা তাদের ব্যবসার বার্ষিক লাইসেন্স নবায়ন করতে পারছেন না। ফলে একদিকে জবাই ও সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ওপর তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত আইনি অনিশ্চয়তা।
কেজিতে বেড়েছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা
সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের আগে কলকাতায় প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হতো প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। বর্তমানে সেটি বেড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু দাম বাড়াই নয়, সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাংসের মানও অনেক ক্ষেত্রে আগের মতো থাকছে না। পাশাপাশি নতুন সরকারের আমলে জনসমক্ষে গরুর মাংস বহন ও খাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আতঙ্ক। এসব কারণে বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে বলে তাদের দাবি।
মাংস ব্যবসায়ী আলফাজ লায়েক পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে মাদক বহনের চেয়েও গরুর মাংস বহন করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হয়রানির আশঙ্কায় তিনি গবাদি পশুর ব্যবসাও গুটিয়ে নিয়েছেন বলে জানান।
মেনু থেকে বাদ বিফের পদ
গরুর মাংসের সংকটের প্রভাব পড়েছে কলকাতার রেস্তোরাঁ ব্যবসাতেও। শহরের বেশ কয়েকটি পরিচিত রেস্তোরাঁ সরবরাহ সংকটের কারণে তাদের মেনু থেকে বিফের বিভিন্ন পদ বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে।
কলকাতার পরিচিত ‘জম জম’ রেস্তোরাঁ গুণগত মানের সঙ্গে আপস না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের শহরের তিনটি শাখাতেই বিফের পদ বিক্রি বন্ধ করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০ শতাংশ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী ‘অলি পাব’-এর জনপ্রিয় বিফ স্টেকও এখন নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ পাওয়া গেলে তবেই তা গ্রাহকদের পরিবেশন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন চিত্র
কলকাতার বাইরে পরিস্থিতি আরো তীব্র বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে জানা গেছে। বারুইপুরের মতো এলাকায় সকাল ১১টার মধ্যেই বাজার থেকে গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, মুসলিম অধ্যুষিত মালদহের কিছু এলাকায় আতঙ্কের কারণে পরিচিত ক্রেতাদের কাছে রাতের অন্ধকারে গোপনে গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নজরদারি এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে ব্যবসা বা কেনাবেচা এড়িয়ে চলছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
দায় ঠেলাঠেলি প্রশাসনের
কসাইখানা বন্ধ থাকা এবং মাংস বিক্রেতাদের লাইসেন্স নবায়নের অচলাবস্থা নিয়ে কলকাতা পুরসভা ও প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দায় চাপানোর অভিযোগ উঠেছে। ফলে সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত ও কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসে গরুর মাংসের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। ফলে নতুন বিধিনিষেধ ও সরবরাহ সংকট শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, এসব সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসেও প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে আগামী দিনে গরুর মাংসের দাম আরো বাড়তে পারে এবং রেস্তোরাঁ ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর সংকটের চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এআরবি