যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে দীপাবলি উৎসবে হামলা চালিয়ে ‘সব ডট হেড’ বা ‘কপালে টিপ দেওয়া’ ভারতীয়দের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার দাবিতে স্লোগান দিয়েছে উগ্র ডানপন্থি জেক ল্যাং-এর নেতৃত্বে রক্ষণশীল কর্মীরা । এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
গত শনিবার সিয়াটল সেন্টার আর্মরিতে আয়োজিত দীপাবলি উৎসবে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় জেক ল্যাং ও তার সহযোগী থমাস অ্যালেন মার্কিন পতাকা হাতে নিয়ে মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে চলছিল একটি নাচের অনুষ্ঠান চলছিল। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘সব ডট হেডকে বহিষ্কার করো’ এবং ‘খ্রিষ্টানদের জায়গায় হিন্দুদের প্রতিস্থাপন বন্ধ করো’।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরে আয়োজকেরা তাদের উৎসবস্থল থেকে বের করে দেন।
সিয়াটল সেন্টার ফেস্টালের অংশ হিসেবে আয়োজিত এ দীপাবলি উৎসবটি বিনা মূল্যে অনুষ্ঠিত ২৫টি সাংস্কৃতিক আয়োজনের একটি। এসব আয়োজনে প্রতিবছর প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ দর্শনার্থী সমাগম হয়।
জেক ল্যাং ‘হোয়াইট রিপ্লেসমেন্ট’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটল ভবনে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও তিনি ছিলেন। এ ঘটনায় তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করেন।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে কংগ্রেস সদস্য প্রমিলা জয়াপাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘এ ধরনের ঘৃণ্য ও বর্ণবাদী প্রদর্শনে আমি চরমভাবে ক্ষুব্ধ। দীপাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপদে এটি উদ্যাপন করার অধিকার রয়েছে। এ ধরনের ঘৃণার কোনো জায়গা আমাদের শহর কিংবা দেশে নেই।’
সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা অজয় জৈন ভুটোরিয়াও ল্যাং ও অ্যালেনের কর্মকাণ্ডকে ‘সম্পূর্ণ ঘৃণ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্ণবাদী গালিগালাজ ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে হিন্দু মার্কিন নাগরিক এবং ভারতীয় অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করার কোনো সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা উচিত নয়।
উত্তর আমেরিকার হিন্দুদের সংগঠন কোয়ালিশন অব হিন্দুস অব নর্থ আমেরিকা (কোহনা) এক বিবৃতিতে বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি দীপাবলি উদ্যাপনের সময় সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্মীরা অন্য উৎসবগুলোও বানচালের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটসের সহপ্রতিষ্ঠাতা সুনীতা বিশ্বনাথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব এখন হিন্দুবিদ্বেষে রূপ নিয়েছে। এর ফলে খ্রিষ্টান উগ্রপন্থিরা ‘সব ডট হেডকে বহিষ্কার করো’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দীপাবলি উৎসবে হামলা চালানোর সাহস পাচ্ছে।
ভারতে বড়দিনে খ্রিষ্টানদের ওপর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর হয়রানির সঙ্গে এ ঘটনার তুলনা করে তিনি বলেন, ভারতে উগ্রপন্থিরা গির্জায় গিয়ে খ্রিষ্টানদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হুমকিমূলক আচরণও নিন্দনীয়। তবে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে খ্রিষ্টানদের ওপর চালানো ঘৃণা ও সহিংসতার ঘটনাগুলোকেও সমানভাবে নিন্দা জানাতে হবে।
এদিকে হিন্দু অধিকারবিষয়ক সংগঠন হিন্দুপ্যাক্ট দীপাবলি উদ্যাপনের সময় সতর্ক থাকার এবং সন্দেহজনক বা বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড নজরে এলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।
ঘটনার একদিন আগেই হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ঐতিহ্যবাহী প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদ্যাপন করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বব ফার্গুসন সিয়াটলে ভারতীয় কনস্যুলেট জেনারেলের আয়োজিত দীপাবলি অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
অনুষ্ঠানে ফার্গুসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের অন্যতম বৃহৎ সম্প্রদায়ের আবাসস্থল ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য। গত দশকে দেশটির অন্য যেকোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় এখানে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এই সম্প্রদায় অঙ্গরাজ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া
এমএমআর