বিএসএফের কাজই যেন এখন কোনো আইন-কানুন বা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে মানুষ ‘পুশ-ইন’ করা। ভারতের এই বেআইনি ও একতরফা পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই চরম ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার।
এর নেপথ্যে রয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের জাতিবিদ্বেষের রাজনীতি। তাদের অলিখিত নিয়মই হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলায় কথা বললেই, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে দেওয়া। আর এই নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে রাতের অন্ধকারে খোদ ভারতীয় নাগরিকদেরই অনেক সময় বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি এমনই এক অমানবিক ও সন্দেহজনক ঘটনার সাক্ষী হলো পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলা।
ভারতের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তারা বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, ভারতে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের মতো জায়গাগুলোতে ‘সার’ (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) বা বিশেষ তল্লাশি চালিয়েও শত শত রোহিঙ্গা বা লাখ লাখ বাংলাদেশির কোনো হদিস তারা পায়নি। উল্টো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর স্পষ্ট অভিযোগ, রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশির নাম করে ভারতীয়দেরই ধরে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রমাণও অতীতে মিলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দিনকয়েক আগে ভারতের চারটি ভিন্ন রাজ্য থেকে ১৮ জনকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার করে মালদায় নিয়ে আসা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জনই নারী ও কিশোরী, আর বাকি চারজন পুরুষ। এদের মধ্যে রাজস্থান থেকে ১০ জন, কেরালা থেকে তিনজন, তেলেঙ্গানা থেকে দুজন এবং মহারাষ্ট্র থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সেসব রাজ্যের পুলিশ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রাজ্যগুলোর কোনোটির সঙ্গেই বাংলাদেশের সরাসরি কোনো সীমান্ত নেই। জানা গেছে, প্রথমে এই ১৮ জনকে বিভিন্ন রাজ্য থেকে এনে রাজস্থানে জড়ো করা হয়। এরপর তাদের ট্রেনে করে হাওড়ায় আনা হয়। কলকাতা হয়ে কড়া পুলিশি পাহারায় তাদের নিয়ে আসা হয় মালদা স্টেশনে। বর্তমানে তাদের রাখা হয়েছে মালদার ইংরেজবাজারের কাছে একটি হোল্ডিং সেন্টারে। সেখান থেকেই তাদের বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার অপেক্ষায় রাখা হয়েছে।
মালদায় আনা এই ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রিমা (৩৪), শিউলা আক্তার (২৩), সোনিয়া আক্তার (২৮), মোসাম্মাৎ রাজিয়া বেগম (৩৪), তসমিয়া ইসলাম ফারিয়া (২২), মোসাম্মাৎ মাফুজা (২৪), আলফনিনা আক্তার (১৯), রোশনে আক্তার মিম (২৩), সোনিয়া খাতুন (২৪), রুমা আক্তার (৩৬), মিস স্মৃতি আক্তার (২৩), কুলসুম আক্তার (২৫), রুবিনা (২৫), আতিয়ার রহমান (২৩), মিস নাসিমা আক্তার (৩৬) এবং তানিয়া সাদিক শেখ (২৮)। মালদা দিয়ে এভাবে মানুষ ফেরত পাঠানোর ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। চলতি মাসের ১ তারিখেই বেঙ্গালুরু থেকে একইভাবে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করে মালদায় এনে পুশব্যাকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
ওই ১৮ জনকে নিয়ে ট্রেনটি যখন মালদায় পৌঁছায়, তখন খবর পেয়ে স্টেশনে হাজির ছিলেন সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকরা। ধৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কিশোরীও ছিল এবং অনেককেই দেখে মধ্যবিত্ত পরিবারের বলে মনে হচ্ছিল। সাংবাদিকরা তাদের কাছে জানতে চান, তাদের বাড়ি কোথায়? কিন্তু তারা সাংবাদিকদের দিকে তাকালেও কেউই কোনো উত্তর দেয়নি। হয়তো আগে থেকেই তাদের কথা বলতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারা শান্তভাবে পুলিশের গাড়িতে উঠে যায়।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৪০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। তাই কেউ যদি অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে বসবাস করতে চায়, তবে তাদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো ভারত সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে। যদি এরা সত্যিই বাংলাদেশি হন, তবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বিজিবির হাতে তুলে দেওয়াই নিয়ম। কিন্তু প্রশাসন এখনও জানায়নি, ঠিক কোন সীমান্ত দিয়ে তাদের পাঠানো হবে। মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, আগের মতো এবারও রাতের অন্ধকারে জঙ্গল বা ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে তাদের বেআইনিভাবে পুশব্যাক করা হবে।
অতীতে এমন জোরপূর্বক পুশব্যাকের সময় অনেকেই কান্নাকাটি করে বলেছেন যে তারা ভারতীয় এবং বাংলাদেশে তাদের কেউ নেই। পরে খোদ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এমন কয়েকজনকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল ভারত।
মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, যেহেতু আটককৃতদের বেশিরভাগই নারী, তাই মহিলা কমিশনের সদস্যদের দিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথিপত্র যাচাই করানো উচিত ছিল। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে, স্রেফ রাজনীতির স্বার্থে তাদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার যে আয়োজন চলছে, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।