মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ তৈরি করছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সংকটের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হতে পারে—অথচ একই সময়ে বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করছে।
ঝুঁকি ও লাভের এই অসম বণ্টন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন এই উদ্বেগ বাড়ছে যে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা বিশ্বজুড়ে বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং ক্ষুধাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, যে বিশ্ব বিপজ্জনকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু সংগঠন 350.org আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হবে। আর যদি সরবরাহ বিঘ্নিত হতে থাকে, তাহলে এই ক্ষতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হিসাবও সম্ভবত কম ধরা হয়েছে। কারণ এতে দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির মতো প্রভাবগুলো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত নয়।
অন্যদিকে, এই সংকট থেকে লাভবান হচ্ছে বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে বিপি জানিয়েছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাদের মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
350.org-এর প্রধান নির্বাহী অ্যান জেলেমা বলেন, “এই বিপুল মুনাফার বড় অংশ এমন একটি যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে, যা ইতিমধ্যেই হাজারো মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং লাখো মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
সংগঠনটি এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত মুনাফার ওপর জরুরি ভিত্তিতে ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এই অর্থ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে ব্যবহার করা উচিত, যা জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় সস্তা, পরিষ্কার এবং বেশি নির্ভরযোগ্য।
এই দাবি প্রতিধ্বনিত হয়েছে সান্তা মার্তায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও, যেখানে ৫০টিরও বেশি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করছে। তবে এদিকে সম্মেলনের বাইরে বিক্ষোভকারীরা “আর পেট্রোলিয়াম নয়” স্লোগানে মিছিল করে এবং কয়লা বন্দর অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়।
অনেক উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, জ্বালানি সংকট তাদের অর্থনীতিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ু দূত টিনা স্টেগে জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে এবং সরকারি সেবা সীমিত করতে হচ্ছে।
একইভাবে মালাউইয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও খাদ্য খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সরকারকে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর কথা ভাবতে বাধ্য করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। দরিদ্র দেশগুলো যেখানে সংকটে জর্জরিত, সেখানে ধনী জ্বালানি কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
এমপি