হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

সরকার বদলালেও দক্ষিণ লেবাননের দখল ছাড়বে না ইসরাইল

আলজাজিরা

দক্ষিণ লেবাননের কিন্নারিত এলাকায় ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু। ছবি: রয়টার্স

ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে সরকার বদলের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এতে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের দখলদারত্বের অবসান হবে বলে মনে করছেন না লেবাননের অনেক মানুষ। তাদের আশঙ্কা, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও লেবাননের প্রতি ইসরাইলের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ, ইসরাইলের রাজনীতিতে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি কিংবা দখলকে ভুল হিসেবে দেখার প্রবণতা নেই।

বৈরুতের বাসিন্দা ফুয়াদ দেবস বলেন, ইসরাইলে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও লেবাননের জন্য বড় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। পরিবর্তন হলেও তা হবে সামান্য। বাইরের বিশ্বকে দেখানোর জন্য এমন পরিবর্তন আনা হতে পারে, যাতে ইসরাইলের সমাজ ও রাজনীতিকে বিশৃঙ্খল বা অশুভ বলে মনে না হয়।

লেবাননের মানুষের এই সংশয়ের পেছনে রয়েছে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের সামরিক তৎপরতার অভিজ্ঞতা। দেশটির আকাশসীমা লঙ্ঘন, স্থল অভিযান ও ভূখণ্ড দখলের ইতিহাসের কারণে ইসরাইলের নেতৃত্বে কে আছেন, তা নির্বিশেষে দেশটির প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির বৈরুতভিত্তিক অনাবাসিক গবেষক করিম সাফিয়েদ্দিন বলেন, ইসরাইলের নির্বাচনের আগে দেশটির রাজনীতিকেরা যা বলছেন, তা থেকেই পরিস্থিতি বোঝা যায়। তাদের কেউই লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না। দক্ষিণ লেবাননের দখলকে সংকট বা ভুল হিসেবেও দেখছেন না তারা। সাফিয়েদ্দিনের মতে, ইসরাইলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো লেবাননকে নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখে।

*যেভাবে সংঘাত ছড়িয়েছে*

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল ও লেবাননের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় সংঘাত চলছে। ওই মাসে হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরাইলে হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর লেবাননেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।

ইসরাইল দুই দফায় সংঘাতের তীব্রতা বাড়ায়। প্রথম দফায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এবং দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের মার্চে। মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর সংঘাত আরও বেড়ে যায়।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবানন সরকার একটি কাঠামোগত চুক্তিতে সই করে। এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছিল, যা হিজবুল্লাহ প্রত্যাখ্যান করে। চুক্তিতে ধাপে ধাপে লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রেখেছে ইসরাইল। সেখানে কয়েক ডজন গ্রামের বাড়িঘর ও অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ইসরাইলের সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত, তা নিয়ে লেবাননের মানুষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জাদ মেলকি ও তার দলের ২০২৬ সালের জুনে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ মানুষ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা সমর্থন করেন। অন্যদিকে ৩৫ শতাংশ মানুষ সশস্ত্র প্রতিরোধের পক্ষে। তবে কৌশল নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইসরাইল সম্পর্কে তাদের মনোভাব নেতিবাচক। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ মানুষ ইসরাইলকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

*নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট*

আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধ পরিচালনা করে আসছেন নেতানিয়াহু। ওই যুদ্ধে সাংবাদিক, জরুরি সেবাকর্মী ও শিশুসহ প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

ইসরাইলের অনেক ভোটার আইজেনকোটকে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে দেখছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক বিচার চলছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া এবং ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তির চেয়ে গাজায় হামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

তবে লেবাননের মানুষের আশঙ্কা, নেতানিয়াহুর জায়গায় অন্য কেউ এলেও দখলদারত্ব ও ধ্বংসযজ্ঞের বর্তমান নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে না।

আইজেনকোট নিজেও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তিনি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল ও প্রধান ছিলেন। ২০০৬ সালে লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধের সময় তিনি উত্তরাঞ্চলীয় ফ্রন্টের কমান্ডার ছিলেন। এ ছাড়া ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’ নামে পরিচিত ইসরাইলি সামরিক কৌশলের প্রণেতা তিনি। এ কৌশলে ব্যাপক ও অসম মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর নীতি অনুসরণ করা হয়। গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি আইজেনকোট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ তুলেছেন। এপ্রিল থেকে বৈরুতে হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, লেবাননের যেকোনো স্থানে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর হামলা চালানো উচিত।

*ইসরাইলের রাজনীতিতে মানবাধিকারের প্রশ্ন*

লেবাননের বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে তাঁকে আক্রমণ করছেন। তাঁদের সমালোচনায় মানবিকতা বা মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।

গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তবে লেবাননের গবেষক ও পডকাস্টার এলিয়া আইয়ুব আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের নির্বাচনে যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁরা যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছেন ঠিকই। কিন্তু মানবিকতা বা মানবাধিকারের ভিত্তিতে তাঁর সমালোচনা করছেন না।

আইয়ুবের মতে, লেবাননসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য জনগোষ্ঠী ও দেশের প্রতি ইসরাইলের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নেতানিয়াহু সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরাইলি সাংবাদিকদের তৈরি ‘নাজা’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের পর দেশটির সরকার ও সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ওই প্রামাণ্যচিত্রে ইসরাইলি সেনারা গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষকে পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হারে হত্যার বিষয়ে কথা বলেছেন।

আইয়ুব বলেন, ইসরাইলি সমাজে অন্যদের অমানবিকভাবে দেখার প্রবণতা গভীরভাবে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়। তাই ইসরাইলের নেতৃত্ব বদলালেই লেবাননের প্রতি দেশটির নীতিতে পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না।

*যুদ্ধ নেই, শান্তিও নেই*

গত জুনের কাঠামোগত চুক্তির পর লেবানন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আটকে আছে। দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি লড়াই অনেকটাই বন্ধ থাকলেও ইসরাইলের ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধও সামান্য।

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের দখলদারত্ব ক্রমেই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এতে অনেক লেবানিজের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি আরও একটি প্রজন্ম ধরে চলতে পারে।

করিম সাফিয়েদ্দিন বলেন, লেবানন দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এক ধূসর পরিস্থিতিতে থাকবে।

তাঁর মতে, আগামী সপ্তাহের ইসরাইলি নির্বাচন লেবানন ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে ইসরাইলের নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে, এমন সম্ভাবনা কম।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এলিয়া আইয়ুব। তাঁর মতে, ইসরাইলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রভাব ইসরাইলের নির্বাচনের মতোই, এমনকি তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

আইয়ুব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নির্ধারণ করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইল কতটা আগ্রাসী আচরণ করার সাহস পাবে। একইভাবে লেবানন এবং অনেকাংশে সিরিয়ার প্রতিও ইসরাইলের আচরণে এর প্রভাব পড়তে পারে।

‘ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার’

যেভাবে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনীতিতে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন নেতানিয়াহু

ইসরাইলে নতুন সরকার এলে কতটা পাল্টাবে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য

অবরুদ্ধ হেবরনে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইল

কেবল স্বপ্নেই পারস্য উপসাগরে ফিরতে পারবেন ট্রাম্প: ইরান

আল-আকসার ইমামকে ধরে নিয়ে গেল ইসরাইলি বাহিনী

ফ্রান্স ও ইতালিতে বিক্ষোভে ভাঙচুর করলে দায় নিতে হবে অভিভাবকদের

প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধের প্রতিবাদে লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ

হরমুজে মাইনের আঘাতে ২ সুপারট্যাংকারে আগুন

পশ্চিম তীরে ১৫ শহর-জনপদে ইসরাইলি অভিযান, আটক বহু ফিলিস্তিনি