হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলাই যখন কঠিন, বিভাজনে তীব্র মানসিক সংকট

মিডল ইস্ট আই

ফিলিস্তিন ও ইসরাইল নিয়ে কথা বলা এখন শুধু একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; অনেকের কাছে এটি ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক ট্রমা, পরিচয় ও নিরাপত্তাবোধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর মানসিক সংকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যের ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই বিভাজন আরো তীব্র হয়েছে। এমন এক সময়ে লন্ডনের ট্যাভিস্টক ক্লিনিকের সঙ্গে যুক্ত ১২ জন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক নিয়মিত বৈঠকে বসে নিজেদের অনুভূতি, মতপার্থক্য ও ভয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রকাশিত হয়েছে ‘হাউ ডু উই ইভেন টক অ্যাবাউট প্যালেস্টাইন অ্যান্ড ইসরাইল: ওয়ান গ্রুপস এক্সপেরিয়েন্স ইন আনস্পোকেন টেরিটরি’ বইটি।

বইটির সম্পাদক নাদিয়া তাইসির দাব্বাগ, মোনা ফ্রিম্যান, ক্যাথরিন হলিন্স ও ক্যাথি ট্রাপ। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ১৯৬ পৃষ্ঠার বইটিতে প্রবন্ধ, কবিতা, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, পারিবারিক ইতিহাস এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে—একটি সংঘাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ একই ঘটনাকে কত সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখতে পারেন। বইটির উদ্দেশ্য কোনো পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং মানুষ কীভাবে তার পারিবারিক ইতিহাস, ভয়, পরিচয় ও মানসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ঘটনাকে উপলব্ধি করে, সেটি বোঝার চেষ্টা।

এই উদ্যোগের পেছনে ছিল একটি অস্বস্তিকর উপলব্ধি—দুই পক্ষের মানুষ যেন একে অপরের সঙ্গে কথা বলতেই পারছেন না। ৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের পর ব্রিটেনের মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ, শোক ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বেড়ে যায়। ট্যাভিস্টক গ্রুপের সদস্যরা বুঝতে পারেন, নীরবতা সমস্যার সমাধান করছে না। তাই নিজেদের মধ্যেই একটি কঠিন প্রশ্ন তোলা হয়—এত গভীর মতপার্থক্যের মধ্যেও কি মানুষ একে অপরের কথা শুনতে পারে?

বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ নাদিয়া দাব্বাগের। ফিলিস্তিনি পরিচয়ের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এটিকে এমন এক অনুভূতি হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে মনে হয় পৃথিবী ভারসাম্যহীন। ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—তিনি সহিংসতাকে ঘৃণা করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ইতিহাসকে শুধু ৭ অক্টোবর থেকে শুরু করলে ফিলিস্তিনি অভিজ্ঞতার দীর্ঘ পটভূমি বোঝা সম্ভব নয়। তার প্রশ্ন ছিল, ওই হামলার নিন্দা করার পাশাপাশি যে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি তার পেছনে কাজ করেছে, সেটিও কি আলোচনা করা হবে না?

দাব্বাগ গ্রুপের সদস্যদের কাছে শোক, ভালোবাসা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ট্রমা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু প্রথমে তিনি নীরবতার মুখোমুখি হন। পরে ফিলিস্তিনি কবি মোহাম্মদ আল-কুর্দের একটি কবিতার ভিডিও শেয়ার করলে গ্রুপে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ইহুদি সদস্যদের কেউ কেউ এতে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। কারণ তাদের কাছেও ৭ অক্টোবরের ঘটনা শুধু রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; সেটি নিরাপত্তা, পরিচয় এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

সারা উইনিকের অভিজ্ঞতা এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইহুদি পরিবারে বেড়ে ওঠা উইনিক ৭ অক্টোবরের পর নিজের ভেতরে এমন কিছু ভয় ও অনুভূতি আবিষ্কার করেন, যা তিনি আগে নিজের বলে ভাবেননি। তিনি ইসরাইলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচক এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা সম্পর্কে সচেতন হলেও হামলার পর তার মধ্যে ইহুদি সম্প্রদায়কে ঘিরে গভীর বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এই প্রতিক্রিয়ার শিকড় তার পরিবারের পুরোনো ট্রমা ও পরিচয়ের ইতিহাসে নিহিত।

এখানেই বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা। একই ঘটনার প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া শুধু বর্তমান ঘটনার ওপর নির্ভর করে না; তার সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবার, ইতিহাস, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়, পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত ভয়। একজন ফিলিস্তিনির কাছে ১৯৪৮ সালের নাকবা হতে পারে পারিবারিক বাস্তবতার অংশ। একজন ইহুদির কাছে ইউরোপের ইহুদিবিদ্বেষ, হলোকাস্ট কিংবা পরিবারের পালিয়ে বেঁচে থাকার স্মৃতি তার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবোধকে প্রভাবিত করতে পারে। বইটি দেখাতে চায়, এই স্মৃতিগুলোকে অস্বীকার করে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা কঠিন।

তবে সংলাপ মানে দুই পক্ষের অবস্থানকে সমান করে দেওয়া নয়—বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এটি। একজনের কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করা মানে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়। একইভাবে কোনো পক্ষের ঐতিহাসিক ট্রমাকে স্বীকার করা মানে অন্য পক্ষের ওপর সংঘটিত অন্যায়কে অস্বীকার করা নয়। বরং বোঝাপড়ার প্রথম ধাপ হলো, মানুষ কেন একটি ঘটনাকে নির্দিষ্টভাবে দেখছে তা বোঝার চেষ্টা করা।

বইটির লেখকদের মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে। ১৯৪৮ সালের নাকবা কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, ৭ অক্টোবরের ঘটনাকে কীভাবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত কিংবা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের নৈতিক দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এসব প্রশ্নে সবার অবস্থান এক নয়। কিন্তু বইটির বিশেষত্ব এখানেই যে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা আলোচনার টেবিল ছেড়ে চলে যাননি।

এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে—সংলাপ কি সত্যিই মানুষের মন পরিবর্তন করতে পারে? বইটি এর কোনো সহজ উত্তর দেয় না। বরং দেখায়, সংলাপের প্রথম সাফল্য হয়তো মত পরিবর্তন নয়; বরং অন্য মানুষের ভয়, কষ্ট ও স্মৃতিকে শুনতে সক্ষম হওয়া। দীর্ঘ সংঘাতে যেখানে প্রতিটি পক্ষ অন্য পক্ষকে অমানবিক হিসেবে দেখতে শুরু করে, সেখানে অন্যের মানবিক অভিজ্ঞতা স্বীকার করাটাই হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

ফিলিস্তিন ও ইসরাইল প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে বিশ্বজুড়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি মানুষের মানসিক ক্ষত কীভাবে সারবে, সেই প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ যুদ্ধের ক্ষত শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা, ধ্বংস হওয়া ভবন কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের হিসাব দিয়ে শেষ হয় না। তা পরিবার, স্মৃতি, শিশুদের মানসিকতা এবং পরবর্তী প্রজন্মের পরিচয়ের মধ্যেও থেকে যায়।

এই কারণে ‘হাউ ডু উই ইভেন টক অ্যাবাউট প্যালেস্টাইন অ্যান্ড ইসরাইল’ শুধু একটি বইয়ের শিরোনাম নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের জন্যও একটি মৌলিক প্রশ্ন। যখন কোনো সংঘাত নিয়ে কথা বলাই অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন নীরবতা কি সমস্যাকে আরো গভীর করে? আর যদি কথা বলতেই হয়, তবে কীভাবে এমনভাবে বলা যায় যাতে অপর পক্ষের মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার না হয়?

সম্ভবত এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সংঘাতের সমাধান শুরু হওয়ার আগেই সংলাপের প্রয়োজন হয়। সব মতের মিল না হলেও মানুষ যদি অন্য মানুষের কষ্টকে শুনতে পারে, নিজের ভয় ও পূর্বধারণাকে পরীক্ষা করতে পারে এবং ইতিহাসকে একাধিক মানুষের চোখ দিয়ে দেখতে পারে, তবে বিভাজনের দেয়ালে অন্তত একটি দরজা তৈরি হতে পারে। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের দীর্ঘ সংঘাতে সেই দরজাটিই হয়তো এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

ইসরাইলি নির্বাচনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নতুন নির্বাচনের শঙ্কার পূর্বাভাস

সৌদির দুই শহরে আবার হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

সৌদির বিরুদ্ধে এপস্টেইন ফাইলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন হুথিরা

‘ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার’

যেভাবে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনীতিতে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন নেতানিয়াহু

ইসরাইলে নতুন সরকার এলে কতটা পাল্টাবে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য

অবরুদ্ধ হেবরনে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইল

সরকার বদলালেও দক্ষিণ লেবাননের দখল ছাড়বে না ইসরাইল

কেবল স্বপ্নেই পারস্য উপসাগরে ফিরতে পারবেন ট্রাম্প: ইরান

আল-আকসার ইমামকে ধরে নিয়ে গেল ইসরাইলি বাহিনী