ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব ইসরাইলের সীমানা ছাড়িয়ে নয়াদিল্লি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রভাব পড়তে পারে ইরান, গাজাসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৬১টি আসন প্রয়োজন । সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, আরব দলগুলো পেয়েছে রেকর্ড ১৯টি আসন।
নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা, লেবানন ও ইরান যুদ্ধের পর এটিই ছিল ইসরাইলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে নেতানিয়াহু আবারো ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও তার জোটের আসন ৬৮ থেকে কমে ৫৩টিতে নেমেছে। তবে বিরোধীরাও সরকার গঠনের মতো ঐক্য দেখাতে পারেনি।
সরকার গঠনের সম্ভাব্য সমীকরণ
ইসরাইলের সামনে মূলত চারটি সম্ভাবনা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর তত্ত্বাবধায়ক সরকার: জোট সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ সম্ভবত নেতানিয়াহুই পাবেন। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। সমঝোতা না হলে নতুন নির্বাচন হতে পারে।
আইজেনকোটের নেতৃত্বে সরকার: বিরোধী জোটের ৪৮ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যোগ হলে ৬৭ আসন হয়। সংখ্যার হিসাবে সরকার গঠন সম্ভব হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা কঠিন। নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার গঠনে আপত্তি জানিয়েছেন।
জাতীয় ঐক্যের সরকার: লিকুদ ও বিরোধী জোটের কিছু দল এক হয়ে সরকার গঠন করতে পারে। তবে নেতানিয়াহুকে কট্টর ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হবে বিরোধীদের। আইজেনকোট অবশ্য নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
দলত্যাগ কিংবা নতুন নির্বাচন: নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের কয়েকজন সংসদ সদস্যকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করতে পারেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারো নির্বাচন হতে পারে। এতে বাজেট, আইন প্রণয়ন ও নিরাপত্তানীতি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহু দুর্বল হয়েছেন, তবে ক্ষমতার লড়াই থেকে ছিটকে যাননি।
ইরান ও গাজায় কী প্রভাব পড়বে
ইসরাইলের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়েই ইরানের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, লেবাননেও উত্তেজনা রয়েছে এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও অস্থিতিশীল।
আইজেনকোট ক্ষমতায় এলেও ইরান ও হামাসের বিষয়ে ইসরাইলের নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। সাবেক এই সেনাপ্রধান ইরান ও হামাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধী তিনি।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার মূল পার্থক্য অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, জোট রাজনীতি এবং অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ছাড় নিয়ে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবার সামরিক অভিযান শুরু করলে ইসরাইলের যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য হবে না।
তবে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর হাতেই আপাতত নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা ইসরাইলে জাতীয় ঐক্যের চাপ তৈরি করতে পারে। আবার পাল্টাপাল্টি হামলা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকিও বাড়াবে।
এর প্রভাব পড়তে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, নৌপথ ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর ভারতও এর সরাসরি প্রভাব অনুভব করবে।
গাজার প্রশ্নে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—দুজনের অবস্থানই কঠোর। উভয়েই হামাসের নিরস্ত্রীকরণ চান। নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা মোকাবিলায় কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে। তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নতুন কোনো ঐকমত্যের ইঙ্গিত নেই।
ভারত কেন উদ্বিগ্ন
ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক এখন আর শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, পানি, মহাকাশ ও বাণিজ্যেও সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফরে দুই দেশের সম্পর্ক ‘শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারকও সই করে।
মোদি ও নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এই অংশীদারত্বকে দৃশ্যমান করেছে। তবে এর ভিত্তি শুধু দুই নেতার সম্পর্ক নয়। দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা চুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণা সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের সম্পর্ক। ফলে ইসরাইলে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও সহযোগিতা পুরোপুরি থেমে যাওয়ার আশঙ্কা কম।
তবে সম্পর্কে কূটনৈতিক সুর বদলাতে পারে। আইজেনকোট সরকার ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা মোকাবিলায় ভিন্ন কৌশল নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভারতের চ্যালেঞ্জ।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকবে দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি, ড্রোন ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারতের জন্য ইসরাইল গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভবিষ্যতে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিনিময়ে গুরুত্ব বাড়তে পারে, যা ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের লক্ষ্যকে সহায়তা করবে।
তবে ভারতের কূটনৈতিক হিসাব আরও জটিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন। জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথও এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) এবং আই২ইউ২ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্যও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জরুরি। ইসরাইল-ইরান সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়লে এসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শেষ কথা
ইসরাইলের ভোটাররা নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারেননি। নেতানিয়াহু সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন, কিন্তু বিরোধীরাও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। আরব দলগুলো সংসদে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করলেও সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ওপর।
নতুন সরকার এলে ইসরাইলের রাজনৈতিক ভাষা ও কূটনৈতিক আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু ইরান, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট থেকেই যাবে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ইসরাইলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ইরান ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। শেষ পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী থাকবে, তা শুধু কে প্রধানমন্ত্রী হলেন তার ওপর নয়; বরং অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে দুই দেশ পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়, তার ওপর নির্ভর করবে।
সূত্র: এনডিটিভি
আরএ