গাজায় টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি হামলায় উপত্যকার পানি অবকাঠামো প্রায় ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পানি-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে গাজার ৮২ শতাংশের বেশি পরিবার । এই সংকট শিশুদের ওপর ফেলছে মারাত্মক শারীরিক প্রভাব।
গাজার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পানি সংগ্রহের জন্য ট্রাকের অপেক্ষায় থাকে ১০ বছর বয়সি মায়সারা জাকুত । প্রায় ২০ লিটার (পাঁচ গ্যালন) ধারণক্ষমতার পাত্র কাঁধে করে পরিবারের তাঁবুতে পানি নিয়ে যায় সে।
মায়সারা আল জাজিরাকে বলেছে, ‘আমাদের তাঁবুতে কোনো পানি নেই—পান করার জন্য নয়, বাসন ধোয়ার জন্য নয়, এমনকি টয়লেটে ব্যবহারের জন্যও নয়।’
১২ বছর বয়সী ইয়ামেন সালেহও পানি বহনের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেছে, ‘প্রতিবার তাঁবুতে পানি নিয়ে যাওয়ার সময় আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা হয়, বিশেষ করে কাঁধ ও পিঠে। এটা খুবই কষ্টকর ও বিব্রতকর।’
চিকিৎসকেরা বলছেন, ভারী পানি বহনের কারণে শিশুদের মধ্যে এমন কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে তাদের বয়সে খুব কমই দেখা যেত। এর মধ্যে হার্নিয়া ও মেরুদণ্ডের বক্রতা বা স্কোলিওসিসের মতো সমস্যাও রয়েছে।
দুই সন্তানের মা ফিদা সালেহ বলেন, বাস্তুচ্যুত জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তার সন্তানদের অতীতের স্বাভাবিক জীবনের স্মৃতিই এখন তাদের সামান্য আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘এই স্মৃতিগুলোই আমাদের কঠোর বাস্তবতায় কিছুটা সুখ খুঁজে পাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
গাজার পুনর্গঠন শুরু না হওয়া পর্যন্ত এসব সমস্যা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরাইলের যুদ্ধে গাজায় ৭৩ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। উপত্যকার বেশিরভাগ মানুষই এখন বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন শিবিরে বসবাস করছেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজার পুনর্গঠন শুরু করা যায়নি। পুনর্গঠনের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ইসরাইল বলছে, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজার পুনর্গঠনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোও নানা সংকটে পড়েছে। পানি ও খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিরা এসব সংস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি বছর ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন ও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফসহ কয়েকটি সংস্থাকে গাজায় তাদের সেবা কমাতে হয়েছে। এর পেছনে মানবিক সহায়তা বহনকারী ট্রাকের প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং তহবিলের সংকট অন্যতম কারণ।
অথচ গাজার বিপুলসংখ্যক মানুষের এখনো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন মাথাপিছু ছয় লিটার বা ১ দশমিক ৬ গ্যালন পানি পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। জাতিসংঘের এই সংস্থার মতে, এই পরিমাণ পানি জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ধারিত ন্যূনতম মানেরও অনেক নিচে।
ইউনিসেফ আরো জানায়, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন আরো জরুরি হয়ে পড়েছে।
মাগাজি শিবিরের মেয়র মোহাম্মদ মোসলেহ বলেন, শিবিরটিতে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ইসরাইলি অবরোধের কারণে পানির পাম্প ও জেনারেটর সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ ও জ্বালানির তীব্র সংকট রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, গাজার যেসব এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, সেগুলোর বিস্তারের কারণে পৌর কর্তৃপক্ষের পানির কূপগুলোতে প্রবেশের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তের সঙ্গে এই পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মোসলেহ জানান, মাগাজি শিবিরে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় মাত্র একটি পানির ট্যাংকার রয়েছে। অথচ এই ট্যাংকার দিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারের পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে।
খাবার ও পানির সন্ধানে প্রতিদিনের এই সংগ্রাম পরিবারগুলোকে চরম অসহায় পরিস্থিতির মুখে ফেলছে। শিশুদের জন্য এর মানসিক চাপ আরো গভীর।
মাইসারার মা হুদা জাকুত জানান, খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলে তার মেয়ে প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়ে।
হুদা বলেন, ‘আমার মেয়ে তাঁবুতে ঢুকল, কাঁদছিল এবং তার হাতে ছিল একটি খালি বাটি—দৃশ্যটি দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সে শুধু নিজের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কষ্ট পায়নি; পরিবারের জন্য খাবার আনতে না পারার বিষয়টিও তাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল।’
সূত্র: আল জাজিরা
আরএ