পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থান ডেড সি বা ‘মৃত সাগর’ দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে পরিবেশগত বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসা অনন্য এই প্রাকৃতিক জলাশয় কীভাবে রক্ষা করা যাবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো ঐকমত্য হচ্ছে না।
ইসরাইল, জর্ডান ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সাগরের উপরিভাগের আয়তন গত পাঁচ দশকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংকুচিত হয়েছে।
উষ্ণ আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে ডেড সি প্রতি বছর প্রায় ৪ ফুট (কোনো কোনো হিসাবে ৩ ফুট) করে পিছিয়ে যাচ্ছে। পানি কমে যাওয়ার কারণে উপকূলজুড়ে হাজার হাজার বিপজ্জনক ‘সিঙ্কহোল’ বা ভূগর্ভস্থ গহ্বর তৈরি হচ্ছে। পানি কমে যাওয়ায় স্বাদু পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে প্রাচীন লবণের স্তর গলিয়ে দিচ্ছে। ফলে মাটি ধসে আকস্মিকভাবে এসব বিপজ্জনক গহ্বর তৈরি হচ্ছে। এর ফলে আইন গেদির মতো একসময়ের জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত ও রিসোর্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বর্তমানে ডেড সির চারপাশে ৬ হাজারেরও বেশি সিঙ্কহোল রয়েছে, যা স্থানীয় ব্যবসা ও পর্যটনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
নদী থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া এবং খনিজ উত্তোলন শিল্পকে ডেড সি’র এই পরিণতির জন্য প্রধানত দায়ী করা হচ্ছে। সিরিয়া-লেবানন সীমান্ত থেকে উৎপন্ন জর্ডান নদী এবং এর প্রধান উপনদী ইয়ারমুক থেকে ইসরাইল, সিরিয়া ও জর্ডান বিপুল পরিমাণ পানি নিজেদের প্রয়োজনে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে জর্ডান নদী যেখানে আগে বার্ষিক ১.৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি ডেড সি-তে নিয়ে আসত, এখন তা কমে মাত্র ১০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটারে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া সত্তরের দশকের শেষের দিকে ডেড সি দুটি বেসিনে বিভক্ত হয়ে যায়। এর গভীর উত্তর অংশটি প্রাকৃতিক অবস্থায় থাকলেও দক্ষিণ অংশটি শিল্পকারখানার বাষ্পীভবন পুকুর হিসেবে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ইসরাইল ও জর্ডানের বিভিন্ন কোম্পানি এখান থেকে পটাশ ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উত্তোলনের জন্য প্রতি বছর উত্তর বেসিন থেকে পানি পাম্প করে নিয়ে যাচ্ছে।
ডেড সি-কে বাঁচানোর জন্য একাধিক পরিকল্পনা থাকলেও আঞ্চলিক রাজনীতি, বিপুল খরচ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে কোনোটিই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ২০১৩ সালে লোহিত সাগর থেকে ডেড সি-তে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি আনার বিষয়ে জর্ডান, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। তবে ভিন্ন রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের পানি মেশালে পরিবেশগত সমস্যা হতে পারে
এমন আশঙ্কা এবং শতকোটি ডলার খরচের কারণে প্রকল্পটি থমকে আছে।
অন্য একটি প্রস্তাব হলো জর্ডান নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো। কিন্তু পানি সংকটের এই অঞ্চলে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া তা অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেউ কেউ আবার খনিজ উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোর পানি ব্যবহারের ওপর কর আরোপের দাবি জানিয়েছেন। ইকো পিস মিডল ইস্টের মতো পরিবেশবাদী সংগঠনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক স্তরে কোনো জরুরি তাগিদ না থাকায় ডেড সিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব, তবে অন্তত এর পতন ঠেকিয়ে স্থিতিশীল করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
সূত্র: সিএনএন
এএম