হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

নেতানিয়াহুর ক্ষমতা কি থাকছে, সরকার গঠনে কি নির্ধারক হবেন মুসলিমরা

দ্য টাইমস অব ইসরাইল

নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ইসরাইলি আরব নাগরিক। ছবি: এপি

ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান হতে পারে, আবার বিরোধীরা সম্মিলিতভাবে বেশি ভোট পেলেও ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন তিনি। সরকার গঠনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোন দলগুলো একজোট হতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশটির পরবর্তী সরকারের ভাগ্য।

দ্য টাইমস অব ইসরাইলের রাজনৈতিক প্রতিবেদক আরিয়েলা কারমেলের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে ইসরাইলের প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার দেশটির ২৬তম নেসেটের (পার্লামেন্ট) সদস্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা, একাধিক ফ্রন্টে ধারাবাহিক যুদ্ধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও অতিধর্মীয় দলগুলোর জোটের সঙ্গে বিরোধীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন গাদি আইজেনকোট। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা নিয়ে বিরোধী নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকার গঠনে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

যেভাবে কাজ করে ইসরাইলের নির্বাচনি ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জার্মানির মতো ইসরাইলও সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ। এখানে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; বরং পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়।

ইসরাইলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, রাজনৈতিক দলের তালিকায় ভোট দেন। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নেসেটের ১২০টি আসন বণ্টন করা হয়।

দেশটিতে ভৌগোলিক নির্বাচনি আসন নেই। পুরো ইসরাইলকে একটি নির্বাচনি এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে তেল আবিব, জেরুজালেম কিংবা হাইফার ভোটাররা নিজ নিজ এলাকার প্রার্থী নয়, একই দলীয় তালিকা থেকে প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দেন।

নেসেটে আসন পেতে কোনো দলকে বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। এই হার অতিক্রম করতে পারলে সাধারণত প্রায় চারটি আসন পাওয়া সম্ভব। নির্ধারিত সীমার নিচে থাকা দলগুলো কোনো আসন পায় না এবং তাদের ভোট আসন বণ্টনের হিসাবের বাইরে থাকে।

২০২২ সালের নির্বাচনে প্রতি আসনের জন্য গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার ভোট প্রয়োজন হয়েছিল। তবে ভোটার উপস্থিতি এবং দলগুলোর মধ্যে উদ্বৃত্ত ভোট সমন্বয়ের চুক্তির কারণে এ হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।

এই পদ্ধতির কারণে ছোট রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে একাধিক দলের উপস্থিতি সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

ভোটগ্রহণ ও ফল প্রকাশ

ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের জন্য ১২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র এবং প্রায় ১৮ হাজার ব্যালট বাক্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ভোট গ্রহণের কার্যক্রম তদারকিতে প্রায় ১ লাখ কর্মী নিয়োজিত থাকবেন।

অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ভোটাররা নির্ধারিত কেন্দ্রে কাগজের ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন।

ভোটগ্রহণ শেষ হলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করবে। তবে আনুষ্ঠানিক ফল পেতে আরো সময় লাগবে। বিশেষ করে দুই পক্ষের আসনসংখ্যার ব্যবধান কম হলে সেনাসদস্য ও অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া ভোটের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ফল ৪ নভেম্বর প্রকাশের কথা রয়েছে। ফলাফলের বিরুদ্ধে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত আপিল করা যাবে।

ইসরাইলের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি নাগরিকেরা ভোট দিতে পারেন। দেশটির প্রায় ৭৩ লাখ যোগ্য ভোটারের মধ্যে ৬৫ লাখ ইসরাইলে বসবাস করেন এবং প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার থাকেন বিদেশে। তবে বিদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ নাগরিকের জন্য অনুপস্থিত অবস্থায় ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই; সাধারণত ভোট দিতে তাদের দেশে ফিরতে হয়।

সরকার গঠনের প্রক্রিয়া যেভাবে এগোবে

নির্বাচনের ফল চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচিত দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করবেন, তাকেই দায়িত্ব দেবেন। তিনি যে দলের নেতা কিংবা যে জোট সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, তার নেতা হবেন—এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

ইসরাইলের পার্লামেন্টে ১২০টি আসনের মধ্যে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে ছোট দলগুলোর সমর্থনও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রথম দফায় সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরো ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। তিনি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় কোনো নেতাকে ২৮ দিনের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এর পরও সমাধান না হলে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতা পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট কোনো সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন।

নতুন সরকারকে নেসেটে আস্থাভোটে জয়ী হতে হবে। তবে আইন অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য সব সময় ৬১ জন সদস্যের সমর্থন থাকা বাধ্যতামূলক নয়; পক্ষে ভোট বিপক্ষের চেয়ে বেশি হলেও সরকার দায়িত্ব নিতে পারে।

এই প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে। ফলে ভোট গণনা শেষ হলেও কে হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া নাও যেতে পারে।

নেতানিয়াহুর জোটের আসন কম, এগিয়ে বিরোধীরা

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত ইসরাইলের প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫০ থেকে ৫১টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন।

এ হিসাবের বাইরে রয়েছে আরব-নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট। জরিপ অনুযায়ী, দল দুটি সম্মিলিতভাবে আরো ১৪ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে। ফলে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সামনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে মূল প্রশ্ন হলো, আইজেনকোট এবং তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গীরা আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে রাজি হবেন কি না। নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াখাদ, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস—এই দলগুলোর অবস্থান সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। লিবারম্যানসহ বিরোধী শিবিরের কয়েকজন নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন।

আইজেনকোটের সামনে সরকার গঠনের একাধিক সম্ভাব্য পথ থাকলেও নেতানিয়াহু মূলত তার বর্তমান কট্টর ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল।

আরব ভোটারদের উপস্থিতি হতে পারে নির্ধারক

ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ আরব নাগরিক। নির্বাচনে তাদের বেশি অংশগ্রহণ রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের আসন বাড়াতে পারে। এতে নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠনের সম্ভাবনাও শক্তিশালী হতে পারে।

একই সঙ্গে বেশি ভোট পড়লে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের নির্বাচনি সীমা অতিক্রম করতে প্রয়োজনীয় ভোটের সংখ্যাও বাড়বে। এর ফলে ছোট ডানপন্থি দলগুলো আসন পেতে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ হারাতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ নির্বাচনি প্রচারে সরকারে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণের বিরোধিতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আরব ভোটকেন্দ্রগুলোতে দুই হাজার ‘স্বেচ্ছাসেবক’ মোতায়েনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে দলটি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দেওয়া হয়নি। এ উদ্যোগের কারণে বর্ণবাদী উসকানি ও ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।

ছোট দলগুলোর নির্বাচনি সীমা অতিক্রম করতে পারা বা না-পারাও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল, ইয়োজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস এবং মোতি লেইটনারের চারেদি পাবলিক দলগুলো জরিপে প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করতে হিমশিম খাচ্ছে।

২০২২ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট ৬৪টি আসন পেয়েছিল, যদিও তাকে সমর্থন না করা দলগুলো সম্মিলিতভাবে বেশি ভোট পেয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল বিরোধী দল মেরেতজ ও বালাদ নির্বাচনি সীমা অতিক্রম করতে না পারা। ফলে প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার ভোট আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসেনি, যা সাতটির বেশি আসনের সমান।

এবারও ছোট দলগুলোর ফল নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। উইন্টার কেবল নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, লেইটনারের দল নেতানিয়াহুর মিত্র শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ভোটে ভাগ বসাতে পারে। আবার উইন্টারের দল নির্বাচনি সীমা পার হলে নেতানিয়াহুর জোটই লাভবান হতে পারে।

বিকল্প ১: বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সরকার গঠন

জরিপে বিরোধী শিবিরের সামনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা দেখা গেলেও দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত মতপার্থক্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে ডান, বাম ও আরব দলগুলো একসঙ্গে ছিল। কিন্তু বেনেটের ডানপন্থি ইয়ামিনা দলের কয়েকজন সদস্য সমর্থন প্রত্যাহার করায় এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সেই সরকারের পতন ঘটে।

আইজেনকোটের দলেও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থি প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে বামপন্থি এবং সম্ভাব্য আরব-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে তার দলের সব আইনপ্রণেতা শেষ পর্যন্ত থাকবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হতে পারেন নেতানিয়াহু।

বিকল্প ২: সংখ্যালঘু সরকার

আইজেনকোটের জোট রা’আমের সমর্থন নিয়েও ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলেও নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ইসরাইলের আইনে সরকার গঠনের জন্য সব সময় ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন আবশ্যক নয়। নেসেটে আস্থাভোটে জয়ী হতে পারলে কম আসন নিয়েও সরকার গঠন করা সম্ভব।

জয়েন্ট লিস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারে যোগ না দিয়েও নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে বলে জানিয়েছে। অতীতেও এমন নজির রয়েছে।

১৯৯৩ সালে শাস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক রবিন আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থনে ৫৬ জন জোটসঙ্গী নিয়ে দুই বছরের বেশি সময় সরকার পরিচালনা করেন। তার উত্তরসূরি শিমন পেরেজও ১৯৯৫-৯৬ সালে আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনা করেন।

তবে লিবারম্যান আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সংখ্যালঘু সরকার গঠনের বিরোধিতা করে আসছেন। এ ধরনের সরকার গঠিত হলেও আদর্শগত মতবিরোধ এবং আইনপ্রণেতাদের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে তা টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।

বিকল্প ৩: আবারও নির্বাচন

দলগুলোর নেতারা ধারাবাহিকভাবে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেসেট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন নেতানিয়াহু। এতে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তার ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়তে পারে এবং নতুন জোট গঠনের জন্য তিনি আরো সময় পাবেন।

২০১৯ সালে ইসরাইলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। স্থিতিশীল সরকার গঠনে ব্যর্থতার কারণে দুই বছরের মধ্যে চারবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বেনেট-লাপিদ সরকারের পতনের পর ২০২২ সালে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচন হয়।

ফলে এবারের নির্বাচনও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সূচনা করতে পারে।

বিকল্প ৪: জাতীয় ঐক্যের সরকার

দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এড়াতে প্রেসিডেন্ট হারজগ নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন। কোনো পক্ষ এককভাবে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে এমন সম্ভাবনা সামনে আসতে পারে।

কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন গভির দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু তার বর্তমান কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের বাদ দিয়ে আইজেনকোটকে নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, উইন্টারের দল অতি-ধর্মীয় দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই বৃহত্তর ডানপন্থি সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা বলেছে।

তবে আইজেনকোট বারবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। এমনকি পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চুক্তির মাধ্যমেও তার সঙ্গে সরকারে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন তিনি। নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য নেতা হিসেবে তুলে ধরে প্রচার চালানো আইজেনকোটের জন্য অবস্থান পরিবর্তন করা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

২০২০ সালে বেনি গান্টজ নেতানিয়াহুর সঙ্গে পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চুক্তিতে সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু গান্টজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই সেই সরকারের পতন ঘটে। এ অভিজ্ঞতাও আইজেনকোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে নির্বাচনের আগে কিংবা পরে ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ওপর ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনের চাপ তৈরি হতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গান্টজ ও আইজেনকোটও কিছু সময়ের জন্য নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন সরকারে যোগ দিয়েছিলেন।

নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে তিনি ইসরাইলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নেতানিয়াহু অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সমালোচকদের অভিযোগ, সম্ভাব্য সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া এবং ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?

ইসরাইলের নির্বাচনে শুধু কোন দল কত ভোট পেল, তা দিয়ে সরকার গঠনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে না। কোন দল নির্বাচনি সীমা অতিক্রম করল, ১২০টি আসন কীভাবে বণ্টিত হলো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী নেতারা জোট গঠনে কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলেন—এসব বিষয়ই হবে নির্ধারক।

বিরোধীরা বেশি ভোট পেলেও আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে মতবিরোধ এবং নিজেদের মধ্যে আদর্শগত বিভাজনের কারণে সরকার গঠনে ব্যর্থ হতে পারে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংখ্যালঘু সরকারের দুর্বলতা কিংবা পুনর্নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।

অতএব, ভোটের ফল প্রকাশের পরই ইসরাইলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হবে না; সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর দর-কষাকষিই নির্ধারণ করবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন কে।

এএম

নেতানিয়াহু যেভাবে ইসরাইলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচনে নেতানিয়াহু হারলে ইসরাইলে কী পরিবর্তন আসবে

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের

ইসরাইলের নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় আসা কে এই গাদি আইজেনকোট

ইসরাইলের নির্বাচন: কারা লড়ছেন এবং কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

পশ্চিম তীরে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে ইসরাইল: জাতিসংঘ

গির্জায় হামলার জেরে সিরিয়ায় জর্ডানের বিমান হামলা, নিহত ৭

যুদ্ধের হিসাব, জনতার রায়—নেতানিয়াহুর ভাগ্যপরীক্ষার দিন আজ

নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে ইরানের হামলার ভয় দেখাচ্ছেন নেতানিয়াহু

মক্কা জোটে ইরানের যোগদান নির্ধারণ করবে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ