গাজাবাসীকে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ করে দেওয়া মিরের প্রধান ত্রাণ সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বিমান হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে ইসরাইল। চলতি সপ্তাহে একটি ট্যাক্সিতে চালানো ওই হামলায় নিহত মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি সমবেত হন।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার মিসর বনাম আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগের দিন গাজা সিটির সাবরা এলাকায় এই হামলা চালানো হয়। হামলায় ফিলিস্তিনি নাগরিক আল-ওয়াহিদিসহ (৫৭) আরো তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পথচারী দুই ভাই-বোন রয়েছে, যাদের বয়স যথাক্রমে ১০ ও ৮ বছর।
প্যালেস্টাইনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, ট্যাক্সির ভেতরে থাকা আহমেদ জেহাদ রজব দগমুশ (৩০) নামের আরেকজন এই হামলায় নিহত হয়েছেন। তবে তিনি গাড়ির চালক নাকি যাত্রী ছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গাজায় ‘মিসরীয় ত্রাণ কমিটি’র জনসংযোগ পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আল-ওয়াহিদি। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা, রাস্তাঘাট পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য শিবির তৈরিতে তিনি প্রথম সারির কর্মী ছিলেন।
মিসরীয় কমিটি জানিয়েছে, আল-ওয়াহিদি একজন সম্মানিত সমাজসেবক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তি, ক্ষুধার্তদের অন্নসংস্থান এবং বড় পর্দায় বিশ্বকাপের ম্যাচ প্রদর্শনের আয়োজন করে মানুষের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দিতেন। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজার হাজার হাজার ফুটবল অনুরাগী এসব বড় পর্দায় খেলা দেখে আনন্দ পেতেন। আর্জেন্টিনার কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার আগপর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা মিসরীয় দলের জন্য গলা ফাটিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ফোনে আল-ওয়াহিদির ছেলে ফাওয়াজ বলেন, ‘আমার বাবা গাজার ভুক্তভোগী ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটু বিনোদন দেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি মানুষের তাবু ও ভেঙে পড়া আশ্রয়ন কেন্দ্রের কাছাকাছি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।’
মিসরের দুটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মিসর সরকারের এই ত্রাণ সংস্থায় আল-ওয়াহিদি লজিস্টিকস বা রসদ সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন।
সূত্রগুলো আরো জানায়, মিসরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আল-ওয়াহিদির মৃত্যুর বিষয়টি ইসরাইলের কাছে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে গাজায় ক্রমাগত হত্যাকাণ্ড এবং ত্রাণ কমিটির কাজে বাধা দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন। দাফনের আগে আল-ওয়াহিদির লাশ ফিলিস্তিন ও মিসরের পতাকায় জড়ানো হয়। দিনভর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবেশী ও বন্ধুরা তার বাড়িতে আসেন। ফাওয়াজ জানান, এই সংস্থায় কাজ করা অত্যন্ত ক্লান্তিকর হলেও তার বাবা সবসময় বলতেন, তিনি বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাহায্য করতে চান।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলি হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে স্থল যুদ্ধ কমলেও ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ‘যুদ্ধবিরতি’র সময়ে অন্তত ১ হাজার ৯২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩ হাজার ৫০৭ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজার ১১৮ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এএম