যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে তার ৮০তম জন্মদিন উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ইরানের সঙ্গে একটি বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয় ছিল। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরুন্মুক্ত করা। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়ে অন্তত তিনজনকে হত্যা করে।
এ ঘটনার পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘আজ সকালের বৈরুত হামলাটি হওয়া উচিত হয়নি। বিশেষ করে এমন একটি বিশেষ দিনে, যখন আমরা ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছি।’
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপটি ছিল আরো বেশি রুঢ়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তার কোনো বিচারবুদ্ধি নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বহু বছর ধরে ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাওয়া এ দুই নেতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা।
তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ইরান যুদ্ধ কীভাবে দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে, এ ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্প ‘চিরতরে যুদ্ধ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তিনি মার্কিন জনগণকে বলেছিলেন যে ইরান যুদ্ধ সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে যায় যে পরিস্থিতি ভিন্ন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসা এবং যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষের কারণে ট্রাম্প মার্কিন সেনাদের ফিরিয়ে আনতে এবং তেলের দাম কমাতে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে মরিয়া ছিলেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু কখনোই ইরানের ধর্মীয় শাসকদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক চুক্তির পক্ষে ছিলেন না। ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাকে তিনি তার ‘জীবনের কাজ’ বলে মনে করেন এবং এই যুদ্ধে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে যৌথ হামলার সময় নেতানিয়াহু একে ‘৪০ বছর ধরে লালন করা স্বপ্ন’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
আগামী অক্টোবরের মধ্যে ইসরাইলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই যুদ্ধে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে। ক্ষমতা হারালে তাকে পুরোনো দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি হতে হবে।
এ ছাড়া উত্তর ইসরাইলের হাজার হাজার মানুষ হিজবুল্লাহর রকেট হামলার কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরাইলের অধিকাংশ মানুষ চান হিজবুল্লাহ পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলুক। রাজনৈতিক কারণে এবং ইসরাইলি জনগণের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ এখনই শেষ করতে চান না।
অথচ যুদ্ধের আগের এক বছর তাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে নেতানিয়াহুই ছিলেন প্রথম বিদেশি নেতা, যাকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানানো হয়েছিল। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ‘ইসরাইলের সর্বকালের সেরা বন্ধু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পও নেতানিয়াহুকে একজন ‘মহান যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ বলে প্রশংসা করেছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল।
কিন্তু মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে ইরানের ‘সাউথ পার্স’ গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরাইলি হামলার পর প্রথম বিরোধের আভাস পাওয়া যায়, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প তখন নেতানিয়াহুকে এমনটি করতে নিষেধ করেছিলেন।
এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করে, তখন ইসরাইল দ্রুত জানিয়ে দেয় যে এই চুক্তি লেবাননের জন্য প্রযোজ্য নয় এবং তারা দক্ষিণ লেবাননে তীব্র হামলা চালিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করে।
গত ২০ মে দুই নেতার মধ্যে একটি দীর্ঘ ও নাটকীয় ফোনালাপ হয়। এর ১২ দিন পর যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, তখন নেতানিয়াহু বৈরুতে হিজবুল্লাহর ওপর হামলার নির্দেশ দেন এবং ইরান আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দেয়। তখন ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ফোনে নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন যে তিনি নেতানিয়াহুর ক্ষমতা রক্ষা করছেন অথচ এই হামলার কারণে সবাই ইসরাইলকে ঘৃণা করছে।
পরবর্তীতে জুনের শুরুতে ট্রাম্প ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, নেতানিয়াহুর কাছে চুক্তি মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই, কারণ মূল সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিজেই নেন।
ট্রাম্পের চুক্তি ঘোষণার বিষয়টি নেতানিয়াহুকে বিস্মিত করেছিল। নেতানিয়াহুর গণমাধ্যম সহযোগীরা ট্রাম্পকে ‘লুজার’ বলে আক্রমণ করতে শুরু করে।
নেতানিয়াহু এক্সে (সাবেক টুইটার) ঘোষণা করেন, চুক্তি হোক বা না হোক, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের চমৎকার অংশীদারিত্ব রয়েছে। তবে আমরা হলাম বড় অংশীদার আর ও (নেতানিয়াহু) হলো খুবই ছোট অংশীদার।’
ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি না থাকলে ইসরাইল অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে যেত।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু এখন রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। কারণ তার রাজনৈতিক পুঁজি ছিল ইরানের সাথে সংঘাত এবং ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক, যার দুটিই এখন হুমকির মুখে। তবে ট্রাম্প ইসরাইলের সামরিক সহায়তা বন্ধ বা জাতিসংঘে ভেটো দেওয়া বন্ধ করার মতো কোনো বড় পদক্ষেপ নেবেন না। ট্রাম্প বড়জোর ইসরাইলি নির্বাচনের আগে এটি বুঝিয়ে দিতে পারেন যে নেতানিয়াহুর কারণেই দুই দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই লেবাননের ওপর নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির কথা থাকলেও ইসরাইল হিজবুল্লাহর হুমকি পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে রাজি নয়। গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত সরাসরি আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে লেবানন নিয়ে ইসরাইলের ওপর তিনি অসন্তুষ্ট। তবে ইরান যদি হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় এবং ট্রাম্প যদি মনে করেন ইরান তার সাথে প্রতারণা করছে, তবে নেতানিয়াহু আবার সুবিধা পাবেন। নেতানিয়াহুও হয়তো এই চুক্তি ও আলোচনা নস্যাৎ করার কোনো অজুহাত খুঁজছেন।
সূত্র: সিবিসি নিউজ
এএম