হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

সৌদির ভিশন ২০৩০ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, ওমরাহযাত্রী হতাহতে প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপত্তা

কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল এর বিশ্লেষণ

আমার দেশ অনলাইন

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হামলায় ওমরাহযাত্রী, বিদেশি কর্মীসহ বহু বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুললেও সব ধরনের হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়।

৬ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে সংঘটিত হামলাগুলোকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। হামলার ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক মোহাম্মদ ইউসুফ এবং বাংলাদেশের আলেম মুফতি মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা, হুথিদের সামরিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে।

সংখ্যার চাপে দুর্বল হতে পারে আকাশ প্রতিরক্ষা

সৌদি আরব প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, একাধিক স্তরের রাডার এবং আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হুথিদের সমন্বিত হামলা এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আক্রমণকারীরা উন্নত প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একসঙ্গে অনেক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ করা হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে প্রতিটি হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ ডলার; কিছু সংস্করণের ক্ষেত্রে ব্যয় আরো বেশি হতে পারে। বিপরীতে, একটি সস্তা আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

এই বিশাল ব্যয়ের ব্যবধান প্রতিরক্ষাকারী দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, প্রতিটি হামলা ঠেকাতে ব্যয়বহুল প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে আক্রমণকারীর তুলনায় প্রতিরক্ষাকারীকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস এবং মিত্রদের কাছ থেকে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

হামলায় বেসামরিক মানুষ ও ধর্মীয় যাত্রীদের হতাহত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র মক্কা নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করা ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়া উচিত নয়।

মিসরের আল-আজহারসহ ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাও (ওআইসি) পবিত্র স্থানগামী যাত্রীদের নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা এবং হজ-ওমরাহযাত্রীদের সুরক্ষা সৌদি আরবের জন্য একটি অতিক্রম-অযোগ্য সীমারেখা।

ধর্মীয় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি কেবল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব নয়; বরং যেসব দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ হজ ও ওমরাহ পালনে যান, সেসব দেশেরও এ বিষয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

‘স্যাক্রেড করিডর’ গঠনের প্রস্তাব

ধর্মীয় যাত্রীদের যাতায়াতের পথকে সামরিক সংঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ‘স্যাক্রেড করিডর’ বা পবিত্র যাত্রাপথের একটি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হবে হজ ও ওমরাহযাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথকে স্থায়ীভাবে সামরিক সংঘাতমুক্ত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আওতায় আনা।

এমন প্রস্তাবটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় যাত্রীদের সুরক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

সৌদির ভিশন ২০৩০-এ নতুন চাপ

হামলার প্রভাব শুধু নিরাপত্তা ও বিমান চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরবের অর্থনীতি তেলনির্ভরতা থেকে বের করে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাতে সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশটিকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। কিন্তু রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে বারবার হামলা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

হামলার পর সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার রিয়াদ থেকে নির্ধারিত ফ্লাইটের বড় অংশ বাতিল করতে বাধ্য হয়। ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে যায়। নতুন বিমান সংস্থা রিয়াদ এয়ারের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি এমিরেটস, ইতিহাদ ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার সংযোগ ফ্লাইটেও বিঘ্ন ঘটে।

এ পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন সৌদি আরব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ উদ্যোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীর সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

কোনো দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বা বিপুল সার্বভৌম সম্পদ থাকলেই তার অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি অপরিহার্য।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক দ্বিধা

নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতিটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেছেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তবে সৌদি আরবের অনুরোধের পরও ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পবিত্র স্থান ও ধর্মীয় যাত্রীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য ইয়েমেনের সংঘাতসহ বৃহত্তর আঞ্চলিক বিরোধগুলোর রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।

হুথিদের ইরানের সমর্থনপুষ্ট একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও রয়েছে। ফলে ইরান তাদের সমর্থন দিলেও গোষ্ঠীটির প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত হয়—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে। সেখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে জ্বালানি পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান

আধুনিক যুদ্ধের ঝুঁকি আর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অপেক্ষাকৃত দুর্বল সামরিক শক্তির কোনো গোষ্ঠীও ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করে একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং পরিবহনকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অল্প কয়েকটি স্থানে কেন্দ্রীভূত থাকলে সেগুলোর একটিতে হামলার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শুধু উন্নত অস্ত্র বা বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর নির্ভর না করে অবকাঠামোর বিকল্প ব্যবস্থা, দ্রুত পুনরুদ্ধার সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

ওমরাহযাত্রীদের হতাহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—ধর্মীয় যাত্রী ও নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে সামরিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে রাখা যায়? এর উত্তর খুঁজতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সংঘাত প্রশমন এবং কার্যকর আইনি সুরক্ষা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, প্রযুক্তি ও অর্থ দিয়ে নিরাপত্তার কিছু অংশ নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সমাধান ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অপরিহার্য।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, আল-জাজিরা ও রয়টার্স

আরো চার দিন বন্ধ থাকবে সৌদি আরবের দুই বিমানবন্দর

ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থনে সতর্ক ট্রাম্প

গাজায় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে ভবন, বৃষ্টিতে ডুবছে তাঁবু

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা, বললেন ‘কঠোর জবাবের’ অপেক্ষায় থাকতে

হুথিদের ঠেকাতে হিমশিম খাওয়ায় সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

হুথিদের হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি সৌদির

কারা এই হুথি, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে কেন

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

যুদ্ধের ধাক্কায় সংকুচিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি: আইএমএফ