পারস্য উপসাগরের মরুবেষ্টিত উপদ্বীপ কাতারকে মুক্তা শিকারের অনুন্নত এক জনপদ থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে দেশটির সেই অর্থনৈতিক ভিত্তি এখন মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
কাতার দীর্ঘ তিন দশক ধরে শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলে প্রতিবছর হরমুজ প্রণালি দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে শত শত কোটি ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি করে আসছিল। কাতার তাদের মোট রাজস্বের ৬০ শতাংশেরও বেশি আয় করে গ্যাস ও গ্যাস-সংশ্লিষ্ট রপ্তানি থেকে। এই বিপুল অর্থ দিয়ে কাতার মরুভূমিকে আধুনিক এক মহানগরীতে রূপান্তর করেছে। দোহা থেকে লুসাইল শহর পর্যন্ত মেট্রো রেল সংযোগ, বিলাসবহুল শপিং মল, কৃত্রিম বরফের থিম পার্ক, বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ আয়োজন এবং বিশ্বজুড়ে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম তহবিলের বিনিয়োগ—সবই এসেছে এই গ্যাস সম্পদ থেকে।
তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে কাতার থেকে কোনো গ্যাস বাইরে যেতে পারছে না। একই সঙ্গে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় যানবাহন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী আমদানির পথও বন্ধ হয়ে গেছে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় পর্যটন খাতে ধস নেমেছে এবং ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাস কমে গেছে।
কাতারের গ্যাস উৎপাদনের প্রধান শিল্প কেন্দ্র রাস লাফান বর্তমানে বন্ধ রয়েছে এবং সেখানকার রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ। দোহার দক্ষিণে অবস্থিত বিশাল হামাদ বন্দরে লোডিং ক্রেনগুলো অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এলএনজি বাণিজ্য বন্ধ থাকায় কাতারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে।
স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজরি ফার্ম ‘দ্য এশিয়া গ্রুপ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল দোহার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘জ্বালানি সম্পদ ছাড়া কাতারের এই রূপান্তর সম্ভব হতো না। এ কারণেই কাতার দ্রুত একটি বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে।’
১৯৯০-এর দশকে কাতারের অর্থনৈতিক রূপান্তর শুরু হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘নর্থ ফিল্ড’ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে শীতল করে তরলে (এলএনজি) রূপান্তরের মাধ্যমে কাতার বিশ্বজুড়ে তা রপ্তানি শুরু করে। ১৯৯৬ সালে জাপানে প্রথম ৬০ হাজার টন গ্যাস পাঠানোর পর, ২০১০ সালের মধ্যে দেশটির উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়ায় ৭৭ মিলিয়ন টনে। ২০১৯ সালে তারা ২০২৭ সালের মধ্যে এই উৎপাদন ১২৬ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার জন্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি প্রকল্প হাতে নেয়।
তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। প্রতিবেশী সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কাতারের এমন কোনো বিকল্প পাইপলাইন নেই যা দিয়ে হরমুজ প্রণালি এড়ানো যায়। ফলে ইরানি অবরোধের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট ‘কাতারএনার্জি’ চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করে। এর দুই সপ্তাহ পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রাস লাফান প্ল্যান্টের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে কাতারের উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ শতাংশ হ্রাস পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষতির কারণে হরমুজ প্রণালি আগামীকাল খুলে দেওয়া হলেও পূর্বের উৎপাদন অবস্থায় ফিরতে কয়েক বছর সময় লাগবে। কাতারএনার্জি ইতোমধ্যে কোটি কোটি ডলার হারিয়েছে এবং প্রতিদিন এই ক্ষতি বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আশঙ্কা করছে, চলতি বছর কাতারের অর্থনীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
আইএমএফ-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গুরিনচাস জানান, প্রতিটা দিন এই প্রণালি বন্ধ থাকা কাতারের ভবিষ্যৎকে আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন করছে।
এই যুদ্ধ কাতারের অর্থনীতি বহুমুখীকরণের (ট্যুরিজম ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা হাব) প্রচেষ্টাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কর্মীদের দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য প্রতিদিন পর্যটন খাতে ৬০ কোটি ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে। দোহার ঐতিহ্যবাহী সুক ওয়াকিফ বাজারে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উপস্থিতি এখন অনেক কম।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অ-আবাসিক সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, রাস লাফানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বিমানবন্দরের বিমান হামলার সতর্কবার্তা কাতারের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে, যা সহজে পুনরুদ্ধার হওয়ার নয়।
এই সংকট মোকাবিলায় কাতার সরকার জনগণকে তাৎক্ষণিক ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে কাজ করছে। কাতার তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। সমুদ্রপথ বন্ধ হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে ফলমূল ও খাদ্যশস্য এখন ব্যয়বহুল আকাশপথে বা সৌদি আরবের মাধ্যমে ট্রাকে করে আনা হচ্ছে। এতে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা থাকলেও সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে আমদানিকৃত পণ্যের দাম মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস কাতারের সার্বভৌম রেটিং বজায় রেখে জানিয়েছে, কাতারের বিশাল সঞ্চিত আর্থিক সম্পদ থাকায় গ্যাস রাজস্ব দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও তারা বেতন ও প্রয়োজনীয় সেবা চালু রাখতে পারবে। তবে কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশেই অবস্থান করতে চাপ দিচ্ছে, যাতে বিদেশি পুঁজি ও মেধার চলে যাওয়া রোধ করা যায়।
দ্য এশিয়া গ্রুপের আহমেদ হেলাল বলেন, ‘বিদেশি কর্মীরা যদি দেশ ছাড়তে শুরু করে, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। কাতার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভালো কাজ করেছে, তবে হরমুজ প্রণালি কতদিন বন্ধ থাকে, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।’
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এএম