কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অঞ্চলটির বিপুল অর্থ, তরুণ জনগোষ্ঠী, জ্বালানি সুবিধা, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ভৌগোলিক অবস্থান এ সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে বলে এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
বিশ্বে এআই ও ফিনটেকের বাজার দ্রুত বাড়ছে। এআইয়ের বৈশ্বিক বাজার ২০২৭ সালের মধ্যে ৪০৭ বিলিয়ন থেকে ৯৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে ফিনটেক খাতের আয় গত বছর প্রায় ৫০০ থেকে ৬৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সুবিধা হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। অনেক দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। প্রযুক্তি খাতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে এই তরুণ জনগোষ্ঠী বড় ধরনের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে বিপুল অর্থ রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনিয়োগে কাজে লাগানো সম্ভব।
এআই ডেটা সেন্টারের জন্য বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের তুলনামূলক সস্তা ও প্রচুর জ্বালানি এ ক্ষেত্রে অঞ্চলটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। পাশাপাশি ৫জি নেটওয়ার্ক, ক্লাউড প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের ফলে ডিজিটাল অবকাঠামোও দ্রুত উন্নত হচ্ছে। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী অবস্থানও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে এআই ও ফিনটেক খাতে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর অন্যতম লক্ষ্য অর্থনীতিকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর করা। দেশটির সৌদি ডেটা অ্যান্ড এআই অথরিটি এআই বিনিয়োগ, স্টার্টআপ ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালকে সৌদি আরব ‘এআইয়ের বছর’ হিসেবেও ঘোষণা করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও ২০৩১ সালের মধ্যে এআই খাতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। দেশটিতে এআইবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ তহবিল গড়ে উঠেছে। সরকারি সেবা, জ্বালানি ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের পরীক্ষাও চলছে।
ফিনটেক খাতেও মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামিক ফিনটেক অঞ্চলটির বড় শক্তি হতে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসলামিক ফিনটেকের বৈশ্বিক লেনদেনের পরিমাণ চলতি দশকের মাঝামাঝি প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ছিল এবং দশকের শেষ নাগাদ তা ৩৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকেও এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির জন্য সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল গ্রহণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আরবি ভাষাভিত্তিক এআই ও ইসলামিক ফিনটেকের মতো নিজস্ব শক্তির জায়গাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্লেষক ড. মাজিদ রাফিজাদেহের মতে, জনসংখ্যাগত সুবিধা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জ্বালানি সম্পদ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও সরকারের উচ্চাভিলাষ—এই সবকিছুর সমন্বয়ে মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এআই ও ফিনটেকের বৈশ্বিক কেন্দ্র হওয়ার একটি বিরল সুযোগ পেয়েছে।