মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক দেশে তিন বছর ধরে যুদ্ধ চালাচ্ছে ইসরাইল। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বেÑএটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নানা সূচকে ইসরাইলের অর্থনীতি এখন বেশ চাঙা। তবে অর্থনীতির এই সাফল্যের মধ্যেও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটাররা।
চলতি মাসে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ২৭ অক্টোবরের এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রচারে প্রাধান্য পাচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তা। ডানপন্থি লিকুদ পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকোট—দুজনই দাবি করছেন, ইসরাইলিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারাই সবচেয়ে যোগ্য। আইজেনকোট মধ্যপন্থি ইয়াশার দলের নেতা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে দেশটির অর্থনীতির গতি ব্যাপকভাবে কমে যায়। তবে এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারীদের একটি হয়ে উঠেছে ইসরাইল।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ১ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯ শতাংশে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ইসরাইলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালে ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর পূর্বাভাসের তুলনায় এই হার অনেক বেশি।
গত তিন বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইসরাইলি মুদ্রা শেকেলের মান বেড়েছে। মে মাসে মুদ্রাটির বিনিময়মূল্য ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। একই সময়ে দেশটির পুঁজিবাজারেও বড় উত্থান হয়েছে। প্রধান সূচক টিএ-১২৫ বেড়েছে ১১০ শতাংশের বেশি।
এদিকে ইসরাইলে বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ। সামগ্রিক পরিসংখ্যানে অর্থনীতির চিত্র ইতিবাচক হলেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বড় কারণ জীবনযাত্রার ব্যয়।
প্রযুক্তি খাতের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি
ইসরাইলের অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তি খাত। গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও ইয়েমেনজুড়ে সংঘাত চললেও দেশটির প্রযুক্তি খাত তুলনামূলকভাবে এসব যুদ্ধের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থেকেছে। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় এ খাতে বিনিয়োগও বেড়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধের পরিস্থিতি চললেও প্রযুক্তি খাতে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ পেয়েছে ইসরাইল। দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই খাত থেকে।
গত বছর ইসরাইলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬২০ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই বিনিয়োগ ৭৮ শতাংশ বেশি। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ও পালো আল্টো নেটওয়ার্কসের ইসরাইলি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ ও সাইবারআর্ক অধিগ্রহণ এই বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। দুটি অধিগ্রহণই ছিল রেকর্ড পরিমাণের।
চলতি বছরেও দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪১০ কোটি ডলার, যা এক প্রান্তিকের হিসাবে রেকর্ড।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের পাশাপাশি ইসরাইলের প্রযুক্তি খাত দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকেও সুবিধা পাচ্ছে। প্রতিরক্ষা খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে রাডার ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি সরবরাহকারী শত শত নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্ডার বাড়িয়েছে সামরিক খাত।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক কেরেন উজিয়েল আল–জাজিরাকে বলেন, কর্মসংস্থান ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে ইসরাইলের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও এর মূল চালিকা শক্তি রপ্তানি। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে ইসরাইল এবং দেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রয়েছে।
উজিয়েলের ভাষ্য, ইসরাইলের প্রযুক্তিপণ্য ও সেবার প্রতি আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং নতুন উদ্যোগে পুঁজি সংগ্রহ বেড়েছে। এতে পুঁজিবাজার চাঙা হয়েছে, সম্পদের মূল্য বেড়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এএম