হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে চায় ইরান

আলজাজিরা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাইয়েদ মুজতবা খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য তুলে ধরে মার্কিন জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে তেহরান। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও সামরিক ব্যয়ের চাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে নিয়মিত আক্রমণ করছেন ইরানের কর্মকর্তারা। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও প্রকাশ করা হচ্ছে যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া সংকটের নানা দিক। ইরানের এই প্রচারের লক্ষ্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধিতাকারী ডেমোক্রেটিক পার্টি এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। কয়েক দশক ধরে রক্ষণশীলদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসের মতো এলাকাতেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে রিপাবলিকানদের।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কর্মকর্তারা মার্কিন জনগণের কাছে সরাসরি বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তাদের বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর চাপের বিষয়গুলো।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক ফেলো সিনা তুসি বলেন, ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য বাড়াতে চাইছে তেহরান। এ জন্য তারা সরাসরি মার্কিন জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।

আলজাজিরাকে তুসি বলেন, ইরান যে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতায় আনতে বা মার্কিন রাজনীতিকে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করতে চাইছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং ইরানের যুদ্ধ নিয়ে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য ও প্রচার তুলে ধরছে তেহরান।

মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম নিয়ে খোঁচা

গত বুধবার ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর একটি সংবাদ শেয়ার করেন। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে নেতিবাচক শিরোনামের একটি সংকলনও প্রকাশ করেন তিনি।

ওই পোস্টে ‘রোড রানার’ কার্টুনের একটি দৃশ্যও ছিল। সেখানে দেখা যায়, উইল ই. কোয়োট একটি নিক্ষেপযন্ত্র তৈরি করেছে। কিন্তু সেটি কাজ না করে উল্টো একটি বিশাল পাথর তার দিকেই ছুড়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে উদ্দেশ করে গালিবাফ লেখেন, ‘চলুন, “শতকরা হিসাব নিয়ে খেলি”। জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে নয়, বরং শতকরা বৃদ্ধির হার নিয়ে।’

ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রচারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বেসেন্ট। গত মাসে তিনি জাতীয় ঋণ ও বন্ডবাজার নিয়ে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ক্যাসিনোর সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, তিনি ‘হাউসের’ প্রতিনিধিত্ব করেন। ক্যাসিনোর পরিভাষায় ‘হাউস’ বলতে সাধারণত সেই প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যার দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা থাকে।

গালিবাফের মন্তব্যে সেই বক্তব্যেরই পাল্টা ইঙ্গিত ছিল। তার বক্তব্যের লক্ষ্য, বেসেন্টের আশ্বাস সত্ত্বেও যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে—এ বিষয়টি সামনে আনা।

এর কয়েক দিন আগেও গালিবাফ একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে ঘণ্টার মতো দেখতে একটি বক্ররেখার সঙ্গে ডিজেলের দাম বাড়ার এবং আবাসন কেনার সামর্থ্য ও ভোক্তাদের আস্থা কমার চিত্র তুলে ধরা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে ইরান। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়েছে।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৩৩ ডলারে পৌঁছেছে। এক গ্যালন প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটারের সমান। এটি দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম। অন্যদিকে পেট্রলের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ৩ ডলারেরও কম ছিল।

হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা বারবার দাবি করেছেন। এর পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রণালির আশপাশে বিভিন্ন জাহাজে হামলা বাড়িয়েছে ইরান।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে। গত মাসে সুদের হার বাড়িয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। অথচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানের অভিযোগ

গত ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন জনগণের উদ্দেশে প্রকাশিত এক চিঠিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনে।

তেলসহ জ্বালানির দাম শিগগিরই অনেক কমে যাবে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তা-ও প্রত্যাখ্যান করে আইআরজিসি।

চিঠিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আস্থা কমে গেছে। মার্কিন বন্ডের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিভিন্ন দেশ তাদের হাতে থাকা মার্কিন বন্ড বিক্রি করতেও শুরু করেছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, যার যন্ত্রণা মার্কিনিদের বহু বছর ধরে ভোগ করতে হবে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘আমেরিকানদের জেগে উঠতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নিতে হবে। এখনই সেই সময়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।’

তবে আইআরজিসির এসব বক্তব্য ইরানের পক্ষের দাবি। এগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কী করবেন ট্রাম্প?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনে কোন দল জিতবে, শুধু সেটিই মূল বিষয় নয়। নির্বাচনের পর ট্রাম্প কী পদক্ষেপ নেবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন, অথবা আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যেতে পারেন। তবে ইরাননীতি নির্ধারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো প্রভাব পড়বে—এ ধারণা তিনি নাকচ করেছেন।

গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প বলেন, ইরানিরা অপেক্ষা করছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার ফলাফল কেমন হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী নন।

ট্রাম্প আরো বলেন, নির্বাচনের ফলাফলকে তিনি কোনো গুরুত্ব দেন না এবং ইরানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও এটি তার বিবেচনায় আসে না। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নিতে পারে। সামরিক অভিযানের জন্য অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিতে পারে তারা।

তবে এ বিষয়ে ইরানের ভেতরেই ভিন্নমত রয়েছে বলে মনে করেন সিনা তুসি। তার ভাষ্য, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর অবস্থানের সমর্থক রয়েছেন। এ কারণে দলটি নির্বাচনে জিতলেও ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বেন। এতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে।

তুসি বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনে যে ফলই আসুক না কেন, ইরানের কৌশল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই তেহরানের মূল লক্ষ্য।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের প্রচারযুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে রয়েছে যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য পূরণ এবং নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ।

এএম

ফিলিস্তিনিদের জলপাই ‘চুরি’র অনুমতি দিলেন ইহুদি ধর্মগুরু

এডেন বিমানবন্দরে হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা পেল যাত্রীবাহী বিমান

হরমুজে মাইনের আঘাতে সুপারট্যাংকারে আগুন

ইসরাইলের নির্বাচনে ক্ষমতার চাবিকাঠি হতে পারেন আরব নেতা আব্বাস

ইরানের নিখুঁত হামলায় বিপর্যস্ত উপসাগরীয় দেশ, চাপে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধপরিকল্পনা

ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইয়েমেনে রণক্ষেত্রে উত্তেজনার কেন্দ্রে তাইজ, শহরটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ট্র্যাকিং বন্ধ করে হরমুজ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা, ট্যাংকারে আগুন

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় মার্কিন সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত