ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি শিবিরের ভবিষ্যৎ যখন ঘোর অনিশ্চয়তায়, তখন বিশ্বরাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ মেলাবার তোড়জোড়। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক সংঘাতের ঝুঁকি এবং বিশ্বজুড়ে তেল ও জ্বালানি সংকটের যে মেঘ জমেছিল, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে তাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আল জাজিরা ও রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রধানত চারটি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে:
১. জ্বালানি তেলের বাজার ও সরবরাহ স্থিতিশীলতা
নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা ক্রমাগত বাড়ছিল, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিল। নেতানিয়াহুর বিদায় ঘটলে এবং তুলনামূলক মধ্যপন্থি কোনো সরকার এলে তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি কমবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিরতা কমে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বস্তি ফিরতে পারে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্বের অবসান
নেতানিয়াহুর আমলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন ডেমোক্র্যাট নেতা ও সাধারণ ভোটারদের মাঝে নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছিল। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট বা অন্য কোনো নেতা ক্ষমতায় এলে হোয়াইট হাউজ ও তেল আবিবের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া কূটনৈতিক দূরত্ব বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনা আবার গতি পাবে।
৩. ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলন
গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে নেতানিয়াহু প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছিলেন। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্ররা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে হেঁটে নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা জানিয়েছিল। নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে উগ্র কট্টরপন্থীদের প্রভাবমুক্ত একটি প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
৪. গাজা পুনর্গঠন ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণ
যদিও নেতানিয়াহুর বিকল্প কোনো নেতা রাতারাতি ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি মেনে নেবেন না, তবুও কট্টর উগ্রবাদীদের বাদ দিয়ে সরকার গঠিত হলে পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। পাশাপাশি গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর ১৯ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান কেবল ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন বার্তা দিতে পারে।