যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকার পরও গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে দেশটি। সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের এক প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই ইসরাইলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনের আগমুহূর্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সহিংসতার পেছনের কারণগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। তাদের অভিযোগ, ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করছে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত ও অধীনস্থ করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা চালাচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল।
প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলিতে ১ হাজার ৪৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০০ জন শিশু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত বোর্ড অব পিসের মে মাসের সেই দাবি প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতি ‘মোটামুটি কার্যকর রয়েছে’।
জাতিসংঘের এই স্বাধীন তদন্ত কমিশন তিনজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার অভিযোগে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত কমিশনের সম্মিলিত অনুসন্ধানকে এ বিষয়ে সবচেয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ আইনি বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির সঙ্গে দেওয়া এক বিবৃতিতে কমিশনের চেয়ারম্যান ও ভারতীয় আইনজীবী শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, ‘পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা ও আহত করা এবং বাড়িঘর ধ্বংসের সঙ্গে ইসরাইলের ধারাবাহিকভাবে দায় অস্বীকার করার বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের নির্মূল ও বাস্তুচ্যুত করা এবং তাদের বসবাসের অযোগ্য পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের অংশ।’
কমিশনের অন্য দুই সদস্য হলেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞ ক্রিস সিডোটি, যিনি ২০২১ সালে কমিশন গঠনের পর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন, এবং জাম্বিয়ার বিচারক ফ্লোরেন্স মুম্বা। মুম্বা সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধ তদন্তে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গাজায় ইসরাইলের ধারাবাহিক বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারদের হামলার একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে কমিশন বলেছে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনী ‘গাজায় ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার গণহত্যামূলক অভিপ্রায় নিয়ে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে’।
জেনেভায় জাতিসংঘে ইসরাইলের স্থায়ী মিশন প্রতিবেদনটিকে ‘ভুল তথ্য’ এবং ইসরাইলকে শয়তানি রূপে তুলে ধরার প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছে।
জেনেভায় ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন বলেন, জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের মতো পক্ষগুলোর ‘ইসরাইলের বৈধতা ক্ষুণ্ন করা এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও আত্মরক্ষার মৌলিক অধিকার অস্বীকার করার প্রচেষ্টা’ তিনি নিন্দা জানান।
শিশুদের ওপর নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ
জাতিসংঘের এই প্যানেল প্রথম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গাজায় যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসরাইল গণহত্যা করেছে বলে অভিযোগ তোলে। তখন কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন নাভি পিল্লাই, যিনি সম্প্রতি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু, গুরুতর শারীরিক আঘাত ও মানসিক ক্ষতির শিকার করেছে। কমিশনের ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ড ‘বয়সভিত্তিক নিপীড়নের’ শামিল।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কমিশন গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু যৌন সহিংসতার ঘটনা যাচাই করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন হয়রানিমূলক স্পর্শ, জোরপূর্বক নগ্ন করা এবং শরীরে স্পর্শ করে তল্লাশি চালানো।
গাজায় ইসরাইলের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করার সময় ভূমধ্যসাগরে আটক প্রায় ৫০টি নৌকার একটি নৌবহরের অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার দুটি ঘটনাও তদন্ত করেছে কমিশন।
পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ বাড়ছে বলে জানিয়েছে প্যানেল। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে সেখানে ১ হাজার ৮০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এ মাসে পশ্চিম তীরের আবু ফালাহ গ্রামে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আহত স্থানীয় পরিষদের এক সদস্যকে চিকিৎসকেরা স্ট্রেচারে করে নিয়ে যান।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ফিলিস্তিনিদের ৯৫ শতাংশ হত্যাকাণ্ড এবং ৮২ শতাংশ আহত হওয়ার ঘটনার জন্য দায়ী ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী।
কমিশন বলেছে, ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সম্মিলিত প্রভাব ‘পশ্চিম তীরের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলার’ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
নিরাপত্তা বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃত এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার অংশ বলে উল্লেখ করেছে কমিশন।
পশ্চিম তীরে ৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের কারণে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে ৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
কমিশনের মতে, ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর দখলে নেওয়ার পর থেকে এটিই ওই ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।
প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশ পরিচালনাকারী এই কর্তৃপক্ষ ইসরাইলের চাওয়া তালিকায় থাকা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে বড় ধরনের অভিযান চালানোর সময় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে, যার ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযান ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় দুই বছর ধরে পরিচালিত এসব অভিযানে অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এসব অভিযানের সমালোচনার জবাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভিন্নমত দমন করার উদ্দেশ্যে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেনেভায় জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইব্রাহিম খ্রাইশি বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন ও মানবাধিকার—বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের কাজের অধিকার—সমুন্নত রাখার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেকোনো অসদাচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’