হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

হুথিদের ঠেকাতে হিমশিম খাওয়ায় সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

আমার দেশ অনলাইন

বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী রয়েছে সৌদি আরবের। ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা খাতে দেশটি ব্যয় করেছে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এত বিপুল সামরিক বিনিয়োগের পরও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না রিয়াদ। সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সপ্তাহান্তে ইরান-সমর্থিত হুথিদের একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক হামলার দাবি ঘিরে সৌদি আরবে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও রয়েছে। শনিবারের হামলায় ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক মিশন তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।

ইয়েমেনে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। বছরের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে সৌদি আরব। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত কিছু এলাকা হুথিদের দখলে যাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে রিয়াদ। জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

বারবার এসব হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ব্যবসা ও পর্যটনের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও চলছে।

সামরিক শক্তিতে এগিয়ে সৌদি আরব

সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিচারে সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ। সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে রিয়াদ।

তবে দেশটির নিজস্ব সামরিক অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে আধুনিক অস্ত্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয় সৌদি আরবকে। তাদের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ইউরোফাইটার টাইফুন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড ব্যবস্থা।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব আধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী। উদ্দেশ্য, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে গোষ্ঠীটির অগ্রযাত্রা থামানো।

অন্যদিকে, ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার ও হামলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে হুথিরা। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতাও দেখিয়েছে তারা।

হুথিরা বিভিন্ন গতি ও ধরনের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলার চেষ্টা করে। তাদের উন্নত অস্ত্রের মধ্যে প্যালেস্টাইন-২ নামের মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেটিতে হাইপারসনিক সক্ষমতা আছে বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়া তুফান ক্ষেপণাস্ত্রকে ইরানের ঘদর ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তিত সংস্করণ বলে মনে করা হয়। বুরকান ও বদর সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও তাদের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে।

কেন সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারছে হুথিরা

প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও সৌদি আরবের পক্ষে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সব সময় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির বিশাল আয়তন এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুথিদের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে দেশটির আয়তন এত বড় যে প্রতিটি এলাকায় সব সময় কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবন্দরগুলোর একটি। শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিমানবন্দরটির আয়তন প্রায় ২২৫ বর্গকিলোমিটার।

লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকার আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং বিভিন্ন সেন্সর একত্রে ব্যবহার করলেও সৌদি আরবের মতো প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়।

তার মতে, রাজধানী রিয়াদ, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, পবিত্র নগরী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে হয় সৌদি বাহিনীকে। এত বিস্তৃত এলাকায় প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।

এ ছাড়া ধারাবাহিক হামলার কারণে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের মজুতও কমে আসতে পারে। বিশ্বজুড়েই এসব প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ সীমিত থাকার খবর রয়েছে।

সৌদি বাহিনী অনেক হামলা প্রতিহত করতে পারলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এর মধ্যে তেল স্থাপনা ও রিয়াদের বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলো বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কেন হামলা বাড়াচ্ছে হুথিরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের প্রতিটি হামলা সফল হওয়া জরুরি নয়। মাঝেমধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারলেও তা বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্দ্রেয়াস ক্রিগের ভাষ্য, রিয়াদের বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে বারবার হামলার দাবি থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘ দূরত্বে আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রেখেছে হুথিরা। সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেক হামলা ঠেকাতে পারলেও গোষ্ঠীটি আবারও হামলা চালানোর সামর্থ্য রাখে।

থমাস জুনোর মতে, হুথিরা সংঘাতের প্রচলিত হিসাব বদলে দিতে চাইছে। সৌদি যুদ্ধবিমান যখন হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সানা বিমানবন্দরে হামলা চালাচ্ছে, তখন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে একই ধরনের চাপ তৈরি করতে চাইছে গোষ্ঠীটি।

‘আনসারুল্লাহ’ নামেও পরিচিত হুথি আন্দোলনের রয়েছে কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক দশ হাজার যোদ্ধা। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের লড়াই তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও সহনশীলতা বাড়িয়েছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহু বছর ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে।

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার মাধ্যমে হুথিরা সংঘাতের মূল্য বাড়িয়ে দিতে চাইছে বলেও মনে করেন জুনো। তার মতে, এতে ইয়েমেন যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের আশা আরো কঠিন হয়ে উঠছে। কয়েক বছর ধরে এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমানোর চেষ্টা করছে সৌদি আরব; নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সেই প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রিয়াদ বিমানবন্দর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো রিয়াদকে পর্যটন, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বড় বৈশ্বিক আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। এ ক্ষেত্রে রাজধানীর বিমানবন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, বিমানবন্দরে হামলার তাৎপর্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বারবার হামলার কারণে বিনিয়োগকারী, পর্যটক ও আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক ও মানসিক প্রভাব তাই সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে।

শনিবারের বিমানবন্দর হামলাটি ২০১৫ সালের একটি আত্মঘাতী বোমা হামলার পর সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা ছিল। ঘটনাটি এমন সময় ঘটে, যখন রিয়াদে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনুষ্ঠান ও বিনোদন আয়োজনের মৌসুম শুরু হচ্ছে। রোববার শহরটিতে ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের জ্বালানি সম্মেলনও শুরু হওয়ার কথা ছিল।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে নাগরিকদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রচলন সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। শনিবারের হামলার আগে কয়েকটি দূতাবাসও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য না পাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানায় এবং নিজেদের নাগরিকদের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।

সৌদি আরবের বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় ও আধুনিক অস্ত্রভান্ডার হুথিদের হামলা ঠেকানোর নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। দেশটির বিশাল ভূখণ্ড, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিস্তৃতি, প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ এবং হুথিদের সমন্বিত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কৌশল পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়তে পারে।

সূত্র: এএফপি ও এনডিটিভি

ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থনে সতর্ক ট্রাম্প

গাজায় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে ভবন, বৃষ্টিতে ডুবছে তাঁবু

সৌদির ভিশন ২০৩০ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, ওমরাহযাত্রী হতাহতে প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপত্তা

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা, বললেন ‘কঠোর জবাবের’ অপেক্ষায় থাকতে

হুথিদের হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি সৌদির

কারা এই হুথি, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে কেন

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

যুদ্ধের ধাক্কায় সংকুচিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি: আইএমএফ

রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দায় ফ্লাইট বাতিল করল আমিরাতের ইতিহাদ এয়ারওয়েজ