ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশটির রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তার নেতৃত্বে ইসরাইলের রাজনীতি আরো উগ্র ইহুদিপন্থার দিকে ঝুঁকেছে। ধর্মীয় ও উগ্র ইহুদিপন্থি শক্তির প্রভাবও বেড়েছে। তবে তার দীর্ঘ শাসনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হতে পারে এমন একটি উগ্র ইহুদিপন্থি ও সামরিকতাবাদী রাজনৈতিক বিরোধী শক্তির উত্থান, যার মুখোমুখি এখন তাকেই হতে হচ্ছে।
সমর্থকদের কাছে নেতানিয়াহু ‘রাজা বিবি’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে বিরোধীরা তাকে নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও দুর্নীতির প্রতীক বলে মনে করেন। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যেসব পরিবর্তন এনেছেন, সেগুলোর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না।
১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া নেতানিয়াহু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইসরাইলের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে তিনি জনমনে ক্ষোভ উসকে দেন। ওই সময়ের রাজনৈতিক উত্তেজনা পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
১৯৯৫ সালে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রবিন আততায়ীর হাতে নিহত হন। রবিন তখন ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালাচ্ছিলেন। ইসরাইলের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহুর উসকানিমূলক বক্তব্য ও প্রচার রবিন হত্যার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। হত্যাকারী ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী এক ইসরাইলি।
ওই সময় নেতানিয়াহু লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বে আয়োজিত কয়েকটি সমাবেশে রবিনকে নাৎসি বাহিনীর এসএস সদস্যের পোশাকে দেখানো হয়েছিল। কোথাও তাকে বন্দুকের নিশানায় থাকা অবস্থায় দেখানো হয়। সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ রবিনকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে স্লোগান দেন।
নেতানিয়াহু রবিন হত্যার জন্য নিজের কোনো দায় থাকার কথা অস্বীকার করেন। তবে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের আগে তারা নেতানিয়াহুকে তার বক্তব্যের তীব্রতা কমাতে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা মানেননি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জনতুষ্টিবাদী কৌশল সফল হয়। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি ইসরাইলের সবচেয়ে কম বয়সি প্রধানমন্ত্রী হন। তার লেনদেননির্ভর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধরন উগ্র ইহুদিপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বর্তমানে তার ইহুদিপন্থি জোটের জন্য এসব দল অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
ধর্মীয় শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি
নেতানিয়াহুর শাসনামলে ধর্মীয় আদালতের ক্ষমতা বেড়েছে। দেওয়ানি ও ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও এসব আদালতের কর্তৃত্ব সম্প্রসারিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় গোষ্ঠীর দাবি ও এজেন্ডার প্রতিফলন বেড়েছে। একই সঙ্গে অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে।
রাষ্ট্রের পরিচয় এবং ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মর্যাদার মতো বিষয়েও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মতাদর্শ আইনে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১৮ সালে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে পাস হয় বিতর্কিত ‘জাতিরাষ্ট্র মৌলিক আইন’। এতে বলা হয়, ইসরাইল একমাত্র ইহুদি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র। একই আইনে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরাইলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনটি কার্যকর হওয়া ঠেকাতে দেশটির হাইকোর্টে আবেদন করেছিল। তবে আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের আচরণকে বর্ণবৈষম্য বা বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রমাণ হিসেবে এই আইনসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে আসছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তন
নেতানিয়াহু শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি নিরাপত্তা কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের অনুগত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়োগ দিয়েছেন। আবার যেসব নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নিজের বিরোধী মনে করেছেন, তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর এই দ্বন্দ্ব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। হামলার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় নেতানিয়াহু নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। এর জেরে ২০২৩ সালে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান রোনেন বার তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে বিচার বিভাগে। দুর্নীতির তিনটি মামলায় ২০১৯ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার কারাদণ্ড হতে পারে। তবে নেতানিয়াহু সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিচার বিভাগে পরিবর্তন আনতে তার নেতৃত্বাধীন সরকার বিচারক নিয়োগের দায়িত্বে থাকা ‘বিচারক নির্বাচন কমিটি’র গঠন পরিবর্তন করে আইন পাস করে। এর ফলে ক্ষমতাসীন জোটের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
নেতানিয়াহু এই উদ্যোগকে ‘বিচার বিভাগীয় সংস্কার’ বলে বর্ণনা করেন। তার দাবি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর বিচার বিভাগের কথিত ‘একনায়কত্ব’ বন্ধ করতেই এই পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু বিরোধীরা একে ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যা দেন।
তাদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল হাইকোর্টের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং আদালত ও মন্ত্রীদের আইনবিষয়ক উপদেষ্টাদের ওপর রাজনীতিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে ইসরাইলজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য নিয়ে দেশটির সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়।
স্বাধীন তদারকি দুর্বল করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেতানিয়াহু কয়েক দফায় অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করেন। তবে সে চেষ্টা সফল হয়নি।
অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাদের হাতে এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও ফাঁসের অভিযোগে সামরিক বাহিনীর অ্যাডভোকেট জেনারেলকে বরখাস্ত করতে তিনি সফল হন। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত সেনাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
দুর্নীতির মামলা ও আন্তর্জাতিক চাপ
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০১৯ সালে তার বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা করা হয়। এসব মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে তাকে কারাগারে যেতে হতে পারে। তবে তিনি কোনো অন্যায় করার কথা স্বীকার করেননি।
গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখেও রয়েছেন নেতানিয়াহু। তা সত্ত্বেও তিনি বলছেন, তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। সমর্থকদের কাছে তিনি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার কাঠামোয় পরিবর্তন সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পাশাপাশি আরও বিতর্কিত নীতি বাস্তবায়নের কথাও বলছেন।
নেতানিয়াহুর সমর্থক ও মিত্রদের দৃষ্টিতে, তিনি এমন একজন নেতা, যিনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং অন্যদের তুলনায় বেশি সাফল্য অর্জন করেছেন। বিপরীতে তার বিরোধীরা বলছেন, কয়েক দশকের শাসনে তিনি দুর্নীতি, সামাজিক বিভাজন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়েছেন। ক্ষমতায় গেলে তারা তার শাসনামলে হওয়া ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
কিন্তু নেতানিয়াহুর সময়ে নেওয়া অনেক পরিবর্তন ইতোমধ্যে আইনে পরিণত হয়েছে। ফলে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে ইসরাইলকে বের করে আনা বিরোধীদের জন্য কঠিন হতে পারে।
এএম