ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের সংঘাতের ইতিহাস টেনেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার বক্তব্যের জবাবে তেহরান বলেছে, ইতিহাস টেনে বর্তমানের সামরিক আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, ‘যে ইতিহাসকে সামনে আনবে, তাকে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।’
এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসকে পেছনে রেখে দেওয়া এক ভাষণে রুবিও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আধুনিক পশ্চিমা দেশগুলো আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে। তাদের শিল্প ও সামরিক শক্তিও দুর্বল হয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শক্তি অর্জন প্রয়োজন।
প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে রুবিও বলেন, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্যের রাজা প্রথম জার্কসিসের বাহিনী এথেন্সে হামলা চালিয়েছিল। তারা মন্দির লুট করে, উপাসনালয়ে আগুন দেয় এবং অ্যাক্রোপলিস ধ্বংস করে। পরে এথেন্সের মানুষ ফিরে এসে পেরিক্লিসের শাসনামলে পার্থেনন নির্মাণ করেন। রুবিওর বক্তব্যে এই ঘটনাকে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে পশ্চিমা সভ্যতার টিকে থাকার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা তার এই ইতিহাসচর্চাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন আদায় করতেই ইতিহাসের নির্বাচিত ঘটনা সামনে আনা হচ্ছে।
ইতিহাস টেনে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি
রুবিও তার ভাষণে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও কঠোর বক্তব্য দেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা নেতাদের তিনি ‘উগ্রপন্থী’ বলে অভিহিত করেন।
তার অভিযোগ, তারা এমন একটি ‘মৃত্যুর উপাসনাকারী গোষ্ঠী’ পরিচালনা করছেন, যারা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে শহীদ হওয়ার ধারণাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
রুবিও বলেন, ‘আজ আমরা যেসব হুমকির মুখোমুখি, সেগুলো প্রাচীনকালের নাটকীয় পরিস্থিতির মতোই বাস্তব।’
তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জাতীয় শক্তি অর্জনের চেষ্টা নির্দ্বিধায় চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি লড়াইয়ের তীব্রতা কমলেও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রুবিওর বক্তব্যকে যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখছে তেহরান।
রোমান সম্রাটের পরিণতি স্মরণ করাল ইরান
রুবিওর বক্তব্যের জবাবে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ প্রাচীন ইতিহাসের আরেকটি ঘটনা সামনে আনেন। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ২৬০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাজা প্রথম শাপুরের বাহিনীর হাতে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ান জীবিত অবস্থায় বন্দি হয়েছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, রুবিও গ্রিক, রোমান, খ্রিষ্টীয় ও আধুনিক ইতিহাসকে সরলভাবে উপস্থাপন করেছেন।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের দর্শনের আকর্ষণীয় আবরণের নিচে নিজেদের জবরদস্তি ও শক্তি প্রয়োগের নীতি বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে।
ইরানের ইতিহাসবিদ তুরাজ দারায়েই বলেন, এথেন্সে পারস্যের হামলা নিয়ে রুবিওর বক্তব্য পুরোপুরি মিথ্যা নয়। তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য বাদ দিয়েছেন। গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসসহ কয়েকজনের বিবরণ অনুযায়ী, পারস্যের ওই হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ নেওয়া। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯৮ সালে এথেন্সের বাহিনী পশ্চিম আনাতোলিয়ায় পারস্যের একটি প্রাদেশিক রাজধানী সার্দিসে আগুন দিয়েছিল।
তেহরানের ২৬ বছর বয়সি বাসিন্দা শিমা আল–জাজিরাকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সমর্থন আদায়ের জন্য আড়াই হাজার বছর আগের সংঘাত টেনে আনার বিষয়টি তার পছন্দ হয়নি।
তিনি বলেন, ‘তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। তাই এই মুহূর্তে যা কাজে লাগবে বলে মনে করবে, তা-ই বলবে।’
ইরানকে সম্মান করার আহ্বান
ইরানের সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি-আমিরি পশ্চিমা রাজনীতিকদের দেশটির বিষয়ে সম্মানজনক ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান কোনো রাজনৈতিক ভাষণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া শত্রু নয়। এটি হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি জীবন্ত সভ্যতা, একটি মহান জাতি এবং বিশ্ব ইতিহাসের স্থায়ী বাস্তবতা।
২০২০ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি হত্যার পর ট্রাম্প ইরানের ৫২টি স্থাপনায় ‘খুব কঠোরভাবে’ হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। এসব স্থাপনার মধ্যে ইরানের সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানও থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর বেশি পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইরানের সরকারের আচরণ বদলাতেও ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে ‘একটি সভ্যতার মৃত্যু’ হতে পারে—ট্রাম্পের এমন মন্তব্য দেশটির মানুষের মধ্যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে হতাশা আরো বাড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের জনগণকে তাদের সরকারের হাত থেকে মুক্ত করার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল।
পশ্চিমা ঐক্যের জন্য ইরানকে শত্রু হিসেবে দেখানোর চেষ্টা?
ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক ওয়ালি নাসর মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য একটি অভিন্ন শত্রু চিহ্নিত করাই রুবিওর বক্তব্যের উদ্দেশ্য হতে পারে।
নাসরের মতে, আগে ইসলামকে পশ্চিমা সভ্যতার শত্রু হিসেবে দেখা হলেও এবার সেই জায়গায় ইরানকে বসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে পশ্চিমা দেশগুলোকে একত্র করার পাশাপাশি যুদ্ধে ইউরোপের সীমিত ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হতাশাও প্রতিফলিত হয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গভীর মতপার্থক্য আড়াল করার চেষ্টাও এতে থাকতে পারে।
রুবিওর বক্তব্যের সময় ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতার কথা জানান, যার আওতায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার ডিজেল জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে বিক্রি করা হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে ওঠায় এ সমঝোতার মাধ্যমে দাম কমবে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
নাসরের ধারণা, ট্রাম্পের ঘোষণা ও রুবিওর ভাষণ একসঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোকে এই বার্তা দিতে পারে যে তাদের মনোযোগের মূল শত্রু রাশিয়া নয়, ইরান হওয়া উচিত।
নাসর আরো বলেন, রুবিওর বক্তব্যে ইরানের সাধারণ মানুষ ও দেশটির শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
তার মতে, এতে ওয়াশিংটনের এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে ইরানের জনগণ ও ইরানকে একটি সভ্যতা হিসেবে আলাদা করে দেখা হচ্ছে না।
ইরানের অধিকাংশ মানুষ রুবিওর সাম্প্রতিক বক্তব্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশ এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধীদের কেউ কেউ মনে করেন, রুবিওর বিরোধিতা ইরানের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে, প্রাচীন ইরানি সভ্যতার বিরুদ্ধে নয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও তার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। শনিবার কট্টরপন্থি সংবাদপত্র ‘ভাতান-এ এমরোজ’-এর প্রথম পাতায় প্রাচীন রোমান যোদ্ধার পোশাকে ঢাল ও তলোয়ার হাতে রুবিওর একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। শিরোনাম ছিল ‘প্রাচীন যুদ্ধ’।
পত্রিকাটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের পক্ষে ঐতিহাসিক ও আদর্শিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছেন রুবিও।
এএম