হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান ক্ষেত্র এখন হরমুজ

আমার দেশ অনলাইন

ইরান কেন দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করার হুমকি দিলেও, বাস্তবে একে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা থেকে বিরত ছিল; এবং ২০২৬ সালের যুদ্ধের পর কেন সেই হিসাব বদলে যায়? কারণ, হরমুজ বন্ধ করা ইরানের জন্য একটি ‘শেষ অস্ত্র’। প্রণালিটি বন্ধ করলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না—ইরানের নিজের অর্থনীতি ও তেল রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সাউথ এশিয়া মনিটরে ২৮ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘ইরান অ্যান্ড দ্য স্ট্রেইট অভ হরমুজ ব্লকেড: হোয়াই তেহরান ডিড নট ক্লোজ দ্য স্ট্রেইট আরলিয়ার’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে ব্রিগ্রেডিয়ার সঞ্জয় আগরওয়াল (অব.) এসব মন্তব্য করেন।

হরমুজ কেন ইরানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি ইরানের ভূগোলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তাই ইরান চাইলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং সীমিতভাবে নিয়ন্ত্রণ/বাধা সৃষ্টি করা—দুটি এক জিনিস নয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় পথটিই বেশি কার্যকর মনে করেছে।

পুরোপুরি বন্ধ করলে ইরানেরও ক্ষতি

ইরান নিজেও তেল রপ্তানি, আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ সম্পূর্ণ বন্ধ হলে: ইরানের তেল রপ্তানি কমে যাবে; বৈদেশিক মুদ্রা আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে; খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কঠিন হবে; ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে; যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়বে। অর্থাৎ যে অস্ত্র দিয়ে শত্রুকে আঘাত করা যায়, সেটিই উল্টো নিজের অর্থনীতির বিরুদ্ধেও ব্যবহার হয়। এই কারণেই এতদিন হরমুজ বন্ধ করা ইরানের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত ছিল।

তাহলে ইরান কী করত?

সম্পূর্ণ অবরোধের বদলে ইরান বিভিন্ন সময়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতা, পরিদর্শন, সামরিক টহল এবং নির্দিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করেছে। ২০২৬ সালের মে মাসেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছিল যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল তাদের অনুমতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। এটি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল তৈরি করে: “প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না করেও আমি চাইলে তোমার বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি করতে পারি।”অর্থাৎ হরমুজ ইরানের কাছে শুধু অবরোধের অস্ত্র নয়, কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যসাধনের উপায়।

২০২৬ সালে পরিস্থিতি কেন বদলে গেল?

২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে হরমুজ আর কেবল ইরানের সম্ভাব্য ‘শেষ অস্ত্র’ থাকেনি; প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে সরাসরি সামরিক সংঘাতের অংশ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে, আর ইরান তার সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ৩১ আগস্টের ঘটনাবলিতে লারাক দ্বীপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে মার্কিন হামলা এবং পরবর্তী ইরানি পাল্টা হামলা দেখিয়েছে যে হরমুজ এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র।

ইরানের জন্য নতুন ‘হরমুজ প্যারাডক্স’

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। হরমুজ যত বেশি সময় বন্ধ বা অস্থিতিশীল থাকবে, তত বেশি বিকল্প পথ খুঁজবে বিশ্বের দেশগুলো। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি পথের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা কমতে পারে। অর্থাৎ ইরান যদি দীর্ঘদিন হরমুজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তার সবচেয়ে মূল্যবান ভূকৌশলগত সম্পদের গুরুত্বই ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। এটাই হরমুজ প্যারাডক্স: হরমুজকে যত বেশি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে, বিশ্ব তত বেশি হরমুজকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

চীন, ভারত ও এশিয়ার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজের গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় জ্বালানির বড় অংশ এশিয়ার দেশগুলোতে যায়। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তেল ও জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ভারতের মতো দেশ ইতিমধ্যে হরমুজ সংকটের সময় নিজেদের জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।

সারকথা হলো— ইরান এতদিন হরমুজকে পুরোপুরি বন্ধ করেনি, কারণ সেটি ছিল নিজের অর্থনীতিকে আঘাত করার মতো সিদ্ধান্ত। কিন্তু ২০২৬ সালের যুদ্ধ সেই পুরোনো হিসাবকে বদলে দিয়েছে। এখন হরমুজ নিজেই যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র।

আর দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে—হরমুজকে যত বেশি সময় অস্থিতিশীল রাখা হবে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার তত বেশি বিকল্প পথ তৈরি করবে। ফলে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকৌশলগত উদ্দেশ্যসাধনের উপায়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, দ্য গার্ডিয়ান, এশিয়া টাইমস, আল-জাজিরা, রয়টার্স ও উইকিপিডিয়া

মার্কিন শিক্ষার্থীদের কাছে ইসরাইল গণহত্যায় যুক্ত নেতিবাচক ব্র্যান্ড

জমি যার, টাকা তার—অধিগ্রহণের টাকা পেতে মানববন্ধন

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে নতুন তথ্য দিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

‘আপা আর আসবেন না, আপার চ্যাপ্টার ক্লোজড’: এমপি আবুল খায়ের

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসে যুক্ত হলেন তিন আলেম

রাজবাড়ীতে নারী উদ্যোক্তাকে মারধরের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩

ভারতের জন্য চরম দুঃসংবাদ, অর্থনীতিতে আসছে বড় ধাক্কা

‘ইরানের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের ৯০ শতাংশেরও বেশি অক্ষত’

সাত বছরেও ফেনী জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি

বহুদলীয় গণতন্ত্রই নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রও বিএনপির হাত ধরে এসেছে