হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

হুথিদের হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি সৌদির

বিবিসি

সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল ও গ্যাস স্থাপনায় প্রাণঘাতী হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার পর তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়াও হবে ‘সমানভাবে কঠোর’।

রিয়াদে বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেসে (ডব্লিউপিসি) প্রিন্স আবদুল আজিজ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের জবাবও সমানভাবে গুরুতর হতে হবে।’

গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। রোববার রাজধানী রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর আগের দিন একই বিমানবন্দরের আরেকটি টার্মিনালে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হন। হামলার পর টার্মিনালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হুথিরা বলেছে, পশ্চিম ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি আরবের ‘নিষ্ঠুর আগ্রাসনের’ জবাবে তারা এসব হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলসহ বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সরকারপন্থি বাহিনীকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমান সহায়তা দিচ্ছে।

সোমবার রাতে আবারও রিয়াদে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। হুথিদের এক মুখপাত্র দাবি করেন, তাদের বাহিনী আবারও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এদিকে কাতার এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, তারা সাময়িকভাবে রিয়াদ ও সৌদি আরবের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখবে। আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে আবুধাবি থেকে রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে ইতিহাদ এয়ারওয়েজও। বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শনিবার পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার ভোরে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাদের বাহিনী সৌদি আরবের একটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান, হুথিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া হয়েছিল।

বিমানবন্দরে এক সপ্তাহে চারবার হামলা

রিয়াদের বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের একটি সম্মেলনকেন্দ্রে রোববার বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেস শুরু হয়। গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরটি চারবার হামলার শিকার হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরের একটি স্থাপনা ও মাটিতে থাকা একটি বিমানে দুটি হামলায় তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। তাদের মধ্যে দেশটির রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একজন পাইলট ছিলেন।

শনিবার টার্মিনাল-৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরো কয়েকজন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি, একজন মার্কিন নাগরিক, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানীয়, একজন সিরীয়, একজন ফিলিস্তিনি, একজন সুদানি ও একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (জিএসিএ) তথ্য অনুযায়ী, রোববার একটি নিক্ষিপ্ত বস্তু টার্মিনাল-৪-এ আঘাত হানলে পাকিস্তানের এক বাসিন্দা নিহত হন। একই দিন সন্ধ্যায় দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা হয়। তবে সেখানে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, তাদের বাহিনী পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একটি ড্রোন এবং খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

এদিকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, রোববার রাজধানী সানায় একটি বাড়িতে সৌদি বিমান হামলায় এক শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন।

‘সৌদি আরব নিরাপদ, অতিথিদের সুরক্ষা দেব’

সোমবার বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেসের উদ্বোধনী বক্তব্যে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী হামলার মধ্যেও সম্মেলনে অংশ নেওয়ায় জ্বালানি খাতের নির্বাহী ও নীতিনির্ধারকদের ধন্যবাদ জানান।

প্রিন্স আবদুল আজিজ বলেন, ‘আপনারা জানেন, এই দেশ নিরাপদ। আপনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই।’

তবে তিনি স্বীকার করেন, জ্বালানির নিরাপত্তাকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সৌদি আরবের অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, জনগণ ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে।

এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদিরা নির্ভীক, লড়াকু ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ। আমরা বিশ্বকে প্রমাণ করব, যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাই না কেন, তা কাটিয়ে উঠব।’

এ বিষয়ে হুথিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে রোববার সন্ধ্যায় এক ভিডিওবার্তায় হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাদের বাহিনী রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দুটি তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

তার দাবি, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদি আরবের ১২৪টি বিমান হামলার জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে।

সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার জন্য বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের প্রতি আবারও সতর্কতা জানান সারি। তবে মক্কা ও মদিনার ইসলামের পবিত্র দুই শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এ সতর্কতা প্রযোজ্য নয় বলে জানান তিনি।

সারি বলেন, সৌদি আরবের আগ্রাসন বন্ধ এবং ইয়েমেনের জনগণের ওপর অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের বাহিনী সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে হামলা আরো বাড়াবে।

তার ভাষায়, ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ এবং ‘উত্তেজনার জবাবে উত্তেজনা’—এই নীতি অনুসরণ করা হবে। সৌদি আরবের শত্রুপক্ষের রসদ ও জনবল পাঠানোর ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

হামলার নিন্দা জাতিসংঘের, সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প

শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ ঘটনায় ‘গভীরভাবে মর্মাহত’ হওয়ার কথা জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিদের ওপর সৌদি আরবের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে।

অন্যদিকে ইরান বলেছে, পরিস্থিতির অবনতিতে তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ ইরান বারবার অস্বীকার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সমাধানে দেশটি ‘সংলাপ ও আলোচনার’ আহ্বান জানিয়েছে।

ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে নতুন করে সংঘাত

ইয়েমেনে ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে বছর হুথিরা রাজধানী সানা থেকে সরকারকে উৎখাত করে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র হয়।

চার বছর ধরে চলা একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি গত জুলাইয়ে ভাঙতে শুরু করে। ওই সময় হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সমুদ্র অবরোধ’ ঘোষণা করে। এরপর সৌদি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে তারা।

হুথিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বন্দর ও বিমানবন্দরে সৌদি অবরোধ এবং সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলার জবাবে তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। সানা বিমানবন্দরে হামলার দায় অবশ্য ইয়েমেনের সরকার স্বীকার করেছে।

সরকারের দাবি, অনুমতি ছাড়া একটি ইরানি বিমান যাতে সেখানে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য হামলাটি চালানো হয়েছিল।

গত মাসে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছের কিছু এলাকা থেকে সরকারপন্থি বাহিনীকে সরিয়ে দেয়। প্রণালিটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত।

হুথিরা বলেছে, ওই পথে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য তারা কোনো হুমকি নয়। তবে সৌদি আরবের জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখবে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়াতেও ভূমিকা রেখেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের ওপর বেশি নির্ভর করছিল।

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সরকার হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। সরকারপন্থী বাহিনীর দাবি, সৌদি আরবের জোরালো বিমান সহায়তায় তারা দ্রুত বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের কিছু এলাকা পুনর্দখল করেছে। তবে হুথিরা কোনো এলাকা হারানোর দাবি অস্বীকার করেছে।

এএম

ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থনে সতর্ক ট্রাম্প

গাজায় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে ভবন, বৃষ্টিতে ডুবছে তাঁবু

সৌদির ভিশন ২০৩০ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, ওমরাহযাত্রী হতাহতে প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপত্তা

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা, বললেন ‘কঠোর জবাবের’ অপেক্ষায় থাকতে

হুথিদের ঠেকাতে হিমশিম খাওয়ায় সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

কারা এই হুথি, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে কেন

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

যুদ্ধের ধাক্কায় সংকুচিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি: আইএমএফ

রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দায় ফ্লাইট বাতিল করল আমিরাতের ইতিহাদ এয়ারওয়েজ