সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি এবার প্রচারযুদ্ধেও নতুন কৌশল নিয়েছেন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা । এ লড়াইয়ে তাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের নথি। সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ পাঠিয়েছিলেন—এমন প্রতিবেদন সামনে এনে সৌদি নেতৃত্বের ধর্মীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান, ভিডিও, বক্তব্য ও নানা প্রচারসামগ্রীর মাধ্যমে এ বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন হুথিরা। পশ্চিমা সমর্থিত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব। সেই সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন হুথিরা। নিজেদের প্রচারে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে ইসলামের রক্ষক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেন। এখন এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করে সৌদি শাসকদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলার চেষ্টা করছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইন-সংক্রান্ত কিছু নথি প্রকাশের পর বিষয়টি হুথিদের প্রচারে গুরুত্ব পায়। এসব নথি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি রাজদরবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কাবা শরিফের গায়ে ব্যবহৃত গিলাফ এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে পাঠিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে হুথিদের অভিযোগের জবাব দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
গত মাসে সৌদি আরব অভিযোগ করে, হুথিরা মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষায়, মুসলমানদের উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা এ হামলা ছিল ‘লজ্জাজনক’। হুথিরা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এরপর সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচারে কাবার গিলাফের প্রসঙ্গ সামনে আনে হুথিরা। গোষ্ঠীটির প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত তাদের নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যারা এপস্টেইনকে কাবার গিলাফ দিয়েছিল, তারাই মক্কায় হামলা চালাচ্ছে।’
আল-মাশাতের এই বক্তব্যের নানা সংস্করণ ছড়িয়ে পড়ে হুথিদের প্রচার নেটওয়ার্কে। এর মধ্যে ছিল ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অনুসারী থাকা এক ইয়েমেনি কৌতুকশিল্পীর ভিডিও ভাষ্য এবং দেশটির এক লোকসংগীতশিল্পীর গান।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা ও ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে হুথিরা খুব ভালোভাবে অবগত। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি গোষ্ঠীটির প্রচার কার্যক্রমের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছেন।
আল-বাশার মতে, একসময় হুথিদের প্রচার কার্যক্রম মূলত দুজনের একটি ছোট দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন তা টেলিভিশন চ্যানেল, ওয়েবসাইট, বেতার, সংবাদপত্র, ই-মেইল প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট নিয়ে একটি সংগঠিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রভাবশালীদের একটি নেটওয়ার্কও তাদের প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে দেয়। এদের সবাই যে অর্থের বিনিময়ে কাজ করেন, তা নয়; অনেকে হুথি ও ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর আদর্শের সঙ্গে একমত।
এপস্টেইনকে ঘিরে প্রচারের লক্ষ্য
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মতো হুথিরাও এপস্টেইনকে নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখায় বলে মনে করেন আল-বাশা। তার মতে, এপস্টেইনের নাম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ইহুদি ও জায়নবাদীরা বিশ্ব পরিচালনা করে—এমন ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়াতেও তার নাম ব্যবহার করা হয়।
অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারের অভিযোগে ফৌজদারি মামলার মুখে ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। ওই সময় কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির বক্তৃতায় প্রায়ই এপস্টেইনের প্রসঙ্গ আসে।
চলতি মাসে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি এপস্টেইনের কথা বলেন। ওই হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়। গত সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানা ২০১৪ সালে হুথিদের দখলে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যেও এপস্টেইনের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে এক ভাষণে আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, ‘এপস্টেইনের নথিগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এগুলো এমন এক জায়নবাদী প্রজননকেন্দ্রের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে নেতা ও অভিজাতদের তৈরি করা হয়।’
লন্ডনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের গবেষক মুস্তাফা আয়াদ বলেন, হুথিরা সৌদি আরবের সঙ্গে নিজেদের সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘এপস্টেইন শ্রেণির’ বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। সৌদি নেতাদেরও তারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করছে।
হুথিদের মূল স্লোগানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে মৃত্যুর আহ্বান রয়েছে। আয়াদের মতে, ইসলাম ধর্মের জন্মভূমি সৌদি আরবের শাসকদের এই দুই শত্রুর সঙ্গে একই কাতারে দাঁড় করিয়ে হুথিরা নিজেদের বক্তব্য জোরালো করতে চায়। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও প্রচারে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বোমা হামলায় মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সৌদি যুবরাজকে লক্ষ্য করে প্রচার
হুথিদের প্রচারের বড় লক্ষ্য সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। আয়াদের ভাষায়, এখন তারা খুব নির্দিষ্টভাবে সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং যুবরাজের ভাবমূর্তি নষ্ট করার দিকে প্রায় পুরো মনোযোগ দিচ্ছে।
ইয়েমেনি কৌতুকশিল্পী মুস্তফা আল-মুমর আগে হুথিদের সমালোচনা করেছিলেন এবং এ কারণে কারাগারেও ছিলেন। ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তার বক্তব্য হুথিদের প্রচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে তার সাম্প্রতিক কাজের পেছনে কী কারণ রয়েছে কিংবা তিনি চাপের মুখে এসব করছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বর্তমান সংঘাতে তিনি সৌদি আরব ও যুবরাজ মোহাম্মদের সমালোচনা করে ধারাবাহিকভাবে গান, ভিডিও ভাষ্য ও ছোট নাটক তৈরি করেছেন। জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি মিউজিক ভিডিওতে তাকে সৌদি যুবরাজের চরিত্রে দেখা যায়। সেখানে হুথিদের হামলার খবর শুনে যুবরাজকে ভীত হয়ে গান গাইতে দেখা যায়। ভিডিওর শেষে তাকে নিজের প্রাসাদে বন্দুকের মুখে আটক হতে দেখা যায়। ভিডিওটি ৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষয়ক্ষতিও হুথিদের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দেশটিতে বোমা হামলা শুরু করে। এই অভিযান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দেয়। সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগে ইয়েমেনে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুতে যুদ্ধটি ভূমিকা রেখেছে।
গত মাসে নিউইয়র্কে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে আরবিতে এক অধিকারকর্মীর তিরস্কারের মুখে পড়তে দেখা যায়। হুথির মুখপাত্র আমিল হাইয়ান ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং বিশেষ করে ইয়েমেনে সংঘটিত ‘নৃশংস হত্যাযজ্ঞের’ কারণে বিশ্বজুড়ে সৌদি আরবকে ঘৃণা করা হয়।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত আগস্টে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার পর প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সপ্তাহে জানিয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হুথিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিমান চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের প্রচারকৌশলের প্রভাব
মুস্তাফা আয়াদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতে হুথিদের কিছু প্রচারসামগ্রী মূলত ইরানের প্রচারকৌশলের অনুকরণ। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছাতে ইরান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
ইরানি গোষ্ঠী এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া ভাইরাল লেগো ভিডিও তৈরির জন্য পরিচিত। গত মাসে তারা ইয়েমেনের যুদ্ধ ও বিজয় নিয়ে একটি লেগো অ্যানিমেশন তৈরি করে। এতে সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের লড়াইকে কল্পনাপ্রসূতভাবে তুলে ধরা হয়। ভিডিওতে হুথিদের একটি দলকে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাতে দেখা যায়। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোনালি মূর্তিও দেখানো হয়। শেষে হুথি এক কমান্ডারকে ‘মোখা’ লেখা মগ থেকে পানীয় পান করতে দেখা যায়। লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা দখলের প্রতি এটি ইঙ্গিত করে। একসময় এই বন্দর কফি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ছিল।
হুথিদের প্রচারের বার্তা বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। এমন কিছু ব্যক্তিও গোষ্ঠীটির প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে হুথিদের সরাসরি সম্পর্ক থাকার কথা নয়। তাদের কারো কারো মধ্যে এপস্টেইন ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নিয়ে একই ধরনের আগ্রহ রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মিক্সড মার্শাল আর্টস চ্যাম্পিয়ন এবং জনপ্রিয় ডানপন্থি পডকাস্টার জেক শিল্ডস তাদের একজন। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার তার বিরুদ্ধে ‘ইহুদিবিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও অসহিষ্ণুতা’ ছড়ানোর অভিযোগ করেছে। শিল্ডস নিয়মিত এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে পোস্ট করেন।
সম্প্রতি নিজের অনুষ্ঠানে হুথি ও সৌদি আরবের সংঘাত নিয়ে কথা বলার সময় তিনি গোষ্ঠীটির প্রতিরোধক্ষমতার প্রশংসা করেন। হুথিদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বড় ভক্ত। আমার মনে হয়, তারা বেশ দুর্ধর্ষ।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক অভিযান ও প্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে হুথিরা যে ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চায়, শিল্ডসের এই প্রতিক্রিয়া তারই একটি উদাহরণ।
এএম