হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

সব দেশ ট্রাম্পের বশ্যতা মেনেছে, ব্যতিক্রম শুধু ইরান

আমার দেশ অনলাইন

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ১৩৬তম দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অভিনব পরিকল্পনা হাজির করলেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ইরানি বাহিনীর হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি চড়া ‘টোল’ বা শুল্ক আদায় করবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা স্থায়ী হল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ১৩৭তম দিনে এসে তিনি সম্পূর্ণ নতুন আরেক সিদ্ধান্ত নিলেন—না, শেষ পর্যন্ত কোনো টোল নেওয়া হচ্ছে না!

আরব মিত্রদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে মঙ্গলবার ট্রাম্পের এই ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় হোয়াইট হাউস কতটা দিশেহারা। যে অভিযানটিকে মাত্র ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের একটি ‘ক্লিন অপারেশন’ বা সহজ জয় ভাবা হয়েছিল, তা এখন ২০তম সপ্তাহের এক চরম গোলমেলে ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। স্পষ্টতই, ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক খেয়ালখুশি আর আবেগনির্ভর রণকৌশল কোনো কাজে আসছে না।

নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বমঞ্চে পেশিশক্তি প্রদর্শনকে যিনি অভ্যাসে পরিণত করেছেন, সেই ট্রাম্প এবার ইরানে এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন—যারা সহজে মাথা নোয়াতে রাজি নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া পোস্ট দিয়ে বা শুল্কের হুমকি ছুড়ে যে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ জেতা যায় না, ইরান তা প্রমাণ করে ছাড়ছে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ওয়ালি নাসর বলেন, ‘ট্রাম্প এবার এমন এক দেশের মুখোমুখি হয়েছেন যারা তার নিয়ম মেনে খেলতে রাজি নয়। ট্রাম্পের নিয়ম হলো—প্রথমে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার স্তুতি গাইতে হবে, তারপর তিনি দয়া করে যেটুকু ছাড় দেবেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেইন পলিসি বিভাগের পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক কূটনীতি কিছুটা ভাগ্য এবং প্রতিপক্ষের পিছু হটার সুযোগের ওপর ভর করে টিকে ছিল। কিন্তু গত ৪৭ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তেহরান যে এত সহজে মার্কিন ফাঁদে পা দেবে না, তা ট্রাম্পের বোঝা উচিত ছিল।’

আমেরিকান থিংক ট্যাংক ‘জিসা’-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন হ্যানাহ অতীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতে সীমিত সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে এক ধাক্কায় গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ট্রাম্প মস্ত বড় ভুল করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইরানের শক্তিশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোকে অবমূল্যায়ন করেছেন এবং মার্কিন সামরিক ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করেছেন।

হ্যানাহ সরাসরি বলেন, ‘পেছনের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে। ট্রাম্প ভেবেছিলেন মার্কিন বিমান হামলা আর ট্রুথ সোশ্যালে কড়া পোস্ট দিলেই ইরানের বিপ্লবী সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এর চেয়ে ক্ষতিকারক ধারণা আর হতে পারে না।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘ভুলটা আরো প্রকট হয়েছে কারণ প্রেসিডেন্টের চারপাশে এমন কোনো শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা দল ছিল না, যারা সত্য বলার সাহস রাখতেন। অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জ্ঞানকে উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্টের ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে বিনাপ্রশ্নে মেনে নেওয়া হয়েছে।’

সম্প্রতি ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মোটেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান ছিল না। এটি ছিল মাত্র ৬০ দিনের একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যাতে দুপক্ষ শান্ত হয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে। কিন্তু একটি সাময়িক চুক্তিই যেখানে টিকল না, সেখানে স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তির আশা করা এখন সুদূরপরাহত।

পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্প এখন দ্বিধাগ্রস্ত। তিনি আবার সামরিক পন্থায় ফিরে গিয়ে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরানের একটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ একটি ‘বড়সড় ও জবরদস্ত আঘাত’ হানার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত এই যুদ্ধের বিপক্ষে থাকায়, যুদ্ধের শুরুতে তিনি যেভাবে বেপরোয়া বোমাবর্ষণ করেছিলেন, তেমন কিছু করার সাহস এখন আর দেখাচ্ছেন না।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প এখন একটা খাঁচায় বন্দি। তিনি এমন এক নিষ্ঠুর ও জেদি প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্য উপসাগরে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তাকে জিম্মি করে ফেলেছে।’

এদিকে টোল বা শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আকস্মিক ডিগবাজি প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই দেশ চালাচ্ছেন। সোমবার যখন তিনি ঘোষণা করলেন যে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তার জন্য কার্গো জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক নেওয়া হবে, তখন তিনি প্রকারান্তরে নিজের প্রশাসনের আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক অবস্থানকেই লঙ্ঘন করেছিলেন। এরপর মঙ্গলবার উপসাগরীয় আরব নেতাদের একটি ফোনেই তিনি সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইরানিয়ান স্টাডিজের পরিচালক আব্বাস মিলানি বলেন, ‘আমি মনে করি না ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি আছে। এটাই আসল সমস্যা। তিনি পুরোপুরি সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভর করে চলছেন, যার মধ্যে দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য রয়েছে।

ট্রাম্পের সমালোচনা করে মিলানি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তিনি এই শাসনব্যবস্থার আসল চরিত্র কখনোই বুঝতে পারেননি এবং এখনো বোঝেন না। ইরান আর দশটা দেশের মতো নয়। তারা সবসময় অভাবনীয় চাল চালে এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো সীমায় যেতে পারে।’

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

গাজায় ইসরাইলি হামলায় একই পরিবারের ৪ জন নিহত

মধ্যপ্রাচ্যের ৩ দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

কুয়েতে ইরানের হামলায় পুড়ল যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ কেন্দ্র

ইরানের শিপিং নেটওয়ার্কের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা

চুক্তি না হলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সপ্তম দফায় ইরানের হামলা

ট্রাম্পের দৃষ্টি কেন ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে

ফিলিস্তিনি চিকিৎসককে অবিলম্বে মুক্তির দাবি মার্কিন আইনপ্রণেতার

নৌ-কমান্ডারসহ ৪ হামাস যোদ্ধাকে হত্যার দাবি ইসরাইলের

হরমুজে দুই জাহাজের সংঘর্ষ, ২৩ নাবিককে উদ্ধার করল ইরান