যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন। এ লক্ষ্যে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িকে চিঠি পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। চিঠিতে দুই দেশের মতপার্থক্য কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভ্যান্স চিঠিতে দ্রুত দুই দেশের কর্মকর্তাদের বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহও জানিয়েছেন তিনি। তবে আলোচনার শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা বলতে হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন ভ্যান্স। ইরান রাজি হলে আগামী সপ্তাহেই কাতার অথবা তুরস্কে বৈঠক হতে পারে।
চিঠিটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এতে নির্দিষ্ট কোনো শান্তিচুক্তির শর্ত দেওয়া হয়নি। বরং আলোচনার একটি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কতটা সমঝোতার সুযোগ আছে, তা যাচাই করাই এর উদ্দেশ্য। এর মধ্য দিয়ে ইরানে নতুন করে হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিরত রাখার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন।
নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা রোববার রেজায়িয়ের কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেন।
ইরানের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, প্রস্তাবটি দেশটির নেতারা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। বৃহস্পতিবারের মধ্যে রেজাইয়ের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার কথা ছিল।
তবে ইরান সরকার এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার বলেছেন, তেহরান কূটনীতিকে সফল করার সুযোগ দিতে চায়। একই সঙ্গে দেশের সুরক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্প অবশ্য চিঠির উদ্দেশ্য নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানে চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছাতে সহায়তার বিষয়েই মূলত চিঠিটি লেখা হয়েছে। তবে ভ্যান্সের এই উদ্যোগে তার অনুমোদন ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ভ্যান্সকে কেন বেছে নিল যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজাইকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষণা সংস্থার (আইসিজি) বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, রেজাইকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে ওয়াশিংটনের ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে। দেশটির কঠোর অবস্থানের পক্ষের নেতাদের ওপর রেজাইয়ের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।
ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য অনেকের তুলনায় যুদ্ধ নিয়ে বেশি সতর্ক বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে তার ব্যক্তিগত আপত্তিও ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষক আলি ভায়েজ মনে করেন, তেহরানের কাছে ভ্যান্স এমন একজন ব্যক্তি, যার সঙ্গে কথা বললে তা ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়লে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, সে বিষয়েও ভ্যান্সের ধারণা আছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মূল মতপার্থক্য দূর করা তার জন্য সহজ হবে না।
বিশ্লেষক রুজবেহ পারসি ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বিবেকবান কণ্ঠ’ হিসেবে দেখেন। তার মতে, অন্যদের তুলনায় ভ্যান্স কম অস্থির এবং কূটনীতির পক্ষে। কিন্তু ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বদলানোর মতো প্রভাব তার আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ইরানও ভ্যান্সের কথাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে না, যতক্ষণ না তিনি বাস্তবে ট্রাম্পকে সিদ্ধান্ত বদলাতে রাজি করাতে পারেন।
আজিজি বলেন, ভ্যান্সের আপত্তি সত্ত্বেও এক বছরেরও কম সময়ে ইরান দুই দফা যুদ্ধে জড়িয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ নিয়ে তেহরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। ট্রাম্পই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং তার অবস্থান কতটা বদলাবে, তা অনুমান করা কঠিন।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বললেন ট্রাম্প
আলোচনার উদ্যোগের পাশাপাশি ইরানে নতুন করে হামলার প্রস্তুতির কথাও সামনে আসছে। আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে বলে উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। তিনি সম্ভাব্য আরেকটি অভিযানের প্রসঙ্গে ‘আরেকটি ছোট এপিক ফিউরি’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা হলে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়ে আসছে তেহরান। ইরান বলেছে, এবার তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা, সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবল, তথ্যকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাতেও হামলা চালাতে পারে।
গত ২১ অক্টোবর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মদি এক বিবৃতিতে বলেন, তাদের কৌশলে ‘কোনো লাল রেখা নেই’।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সোমবার তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন সৌদি আরব ও কাতারের কূটনীতিকেরা। পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারাও ওই তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার আশঙ্কা
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার আশঙ্কা বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আলি ভায়েজের ভাষায়, ঝুঁকি ‘বিপজ্জনকভাবে বেশি’।
তার মতে, নির্বাচনের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংযমের বাধা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি এগোচ্ছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
বিশ্লেষক মারজিয়েহ কুহি এসফাহানি মনে করেন, নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা যথেষ্ট বেশি। দুই পক্ষই যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি বর্তমান অচলাবস্থা থেকে বের হতে চায়। তবে শান্তির চেয়ে যুদ্ধের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন তিনি।
রুজবেহ পারসির মতে, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান প্রমাণের চাপে রয়েছে। এ কারণে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা আগের চেয়ে বেশি ভয়াবহ হতে পারে। এতে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এএম