পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খান প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে। কিন্তু দীর্ঘ বন্দিত্বের পরও পাকিস্তানের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি কমেনি—বরং তাকে ঘিরে দেশ-বিদেশে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সাত ক্রিকেট অধিনায়কও তার মানবিক চিকিৎসার বিষয়ে দেশটির সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার লওয়ি ইনস্টিটিউটের ‘দ্য ইন্টারপ্রেটার’-এ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী লেখক ও জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরিয়াল লেকচারার ড. হুসেইন নাদিম। তার নিবন্ধের শিরোনাম ‘ইমরান খান ইজ স্টিল নট আউট’। লেখক ক্রিকেটের ভাষা ব্যবহার করে ইমরানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাকে ব্যাখ্যা করেছেন।
১৯৯২ সালে মেলবোর্নে পাকিস্তানকে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ এনে দেওয়া ইমরান খান ক্রিকেট ছাড়ার পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠা করেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। প্রায় চার বছর পর ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
ক্ষমতা হারানোর পর ইমরানের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়। দুর্নীতি, সন্ত্রাস-সম্পর্কিত অভিযোগসহ বিভিন্ন মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় গুলিতে আহত হয়ে তিনি একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
ইমরান গত প্রায় তিন বছর কারাগারে কাটিয়েছেন এবং এর বড় একটি সময় দীর্ঘ একাকী বন্দিত্বে ছিলেন। গত এক বছরে তার কোনো ছবি প্রকাশ্যে আসেনি এবং পাকিস্তানের গণমাধ্যমে তার নাম উল্লেখের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে।
ইমরানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। লওয়ি ইনস্টিটিউটের নিবন্ধে তার একটি চোখের গুরুতর ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার চিকিৎসা নিয়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টও সম্প্রতি হস্তক্ষেপ করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সরকার ওই নির্দেশ অনুযায়ী তাকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণ করেনি ।
ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সাত ক্রিকেট অধিনায়ক দেশটির সরকারের কাছে ইমরানের বিষয়ে মানবিক আবেদন জানিয়েছেন। সাবেক ক্রিকেটার গ্রেগ চ্যাপেল, ভারতের সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার এবং অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অধিনায়ক প্যাট কামিন্সসহ কয়েকজন ক্রিকেট ব্যক্তিত্বও ইমরানের বিষয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
ড. হুসেইন নাদিমের বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পরও ইমরান খান পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাননি। বরং তার বন্দিত্বই তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ধরে রেখেছে বলে লেখক মনে করেন। তিনি পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইমরানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কথাও উল্লেখ করেছেন।
ইমরানের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে তার ক্রিকেট জীবনেরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। ক্রিকেট মাঠে যে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা ইমরানের পরিচয়ের অংশ ছিল, রাজনীতিতেও তিনি একই ধরনের দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। এ কারণে কারাগারে থেকেও তার রাজনৈতিক উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
ইমরানকে ঘিরে নতুন এই আন্তর্জাতিক মনোযোগের সময়েই পিটিআই ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে তার মুক্তির দাবিতে মার্চের ঘোষণা দিয়েছে। কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজধানীর প্রধান সড়ক বন্ধ, কনটেইনার বসানো এবং বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের খবর এসেছে। সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে ইসলামাবাদের হাসপাতালগুলোকেও জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ফলে ইমরান খানের দীর্ঘ কারাবাস এখন শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। তার স্বাস্থ্য, কারাবন্দিত্ব, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পিটিআইয়ের আন্দোলন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা বাড়ছে।