ব্রিটেনে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছে এবং দেশটির মূলধারার রাজনীতিকেরা তা মোকাবিলায় বিপজ্জনকভাবে উদাসীন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত পক্ষপাতের বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ব্রিটিশ সমাজে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি বৈষম্য ও সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটির গভীরতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে উগ্র ডানপন্থী দলগুলো মুসলিমবিদ্বেষকে নিজেদের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে।
সমসাময়িক ইসলামোফোবিয়ার শিকড় সাম্প্রতিক কয়েক বছরের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা নব্য রক্ষণশীল রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ এবং পরবর্তী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর সময় গৃহীত বিভিন্ন নীতির মধ্য দিয়ে মুসলিমদের প্রতি সন্দেহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনের ‘প্রিভেন্ট’ নীতিও এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সন্দেহের উদাহরণ।
সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ নিয়েও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। মুসলিমদের রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে কখনো কখনো উগ্রবাদ বা নিরাপত্তাঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। এর ফলে মুসলিম নাগরিকদের বৈধ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়াও সমালোচিত হয়েছে। মুসলিম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা সমস্যার সমাধান না করে বরং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সমাজের কাঠামোগত বৈষম্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর দূরে থাকা ইসলামোফোবিয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
বর্ণবাদকে শুধু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। বর্ণবাদ বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে। আজ মুসলিমদের যেভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।
আফগান ও ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের প্রতি ব্রিটেনের আচরণের পার্থক্যও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের উদাহরণ। বিভিন্ন শরণার্থী জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতিতে বৈষম্য থাকলে তা সমাজে বৃহত্তর অসমতার ধারণাকে আরো শক্তিশালী করে।
ইসলামোফোবিয়াকে কেবল ব্যক্তিগত ঘৃণা বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার রাজনৈতিক মাত্রা আড়ালে থেকে যাবে। ব্রিটিশ রাজনীতিকদের এখন মুসলিমবিদ্বেষকে স্পষ্টভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং একই সঙ্গে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির জন্য আরো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।