জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বরিশালের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মখলেছুর রহমান ও উপসচিব শারমিন ইয়াসমিন বরিশালে এসে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে ঢাকায় ফিরেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির সদস্যরা বরিশাল জেলা প্রশাসনের বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত, ভিডিও ও মৌখিক বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং সরেজমিন অনুসন্ধান করেছেন।
এর আগে গত ৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মখলেছুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং একই বিভাগের উপসচিব শারমিন ইয়াসমিনকে সদস্য করে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে বরিশালের হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় অতিরিক্ত অস্থায়ী ভোটকক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র দেখিয়ে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে সাবেক জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থ বিভিন্ন বিলের সঙ্গে সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিল-ভাউচার নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তার কন্ট্রোল রুম, ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও তাঁর দপ্তর এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত পর্যবেক্ষক দলসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ করা ১৪ লাখের বেশি টাকা খরচ না করেও বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল সদরসহ ১০টি উপজেলায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আপ্যায়ন বাবদ বরাদ্দ ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার বড় একটি অংশ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়। কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আপত্তির কারণে পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে গত ১১ ও ১৪ মে সাবেক জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক আমার দেশ। প্রতিবেদন প্রকাশের পর বরিশালসহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার অপসারণ ও অভিযোগ তদন্তের দাবি ওঠে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে ১৯টি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি চাওয়া হয়েছে। তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, তদন্ত কমিটি সাবেক জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালীন বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল-অমিল যাচাই করেছে।
তদন্ত কমিটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে বরিশাল জেলায় নির্বাচন কমিশনের খাতওয়ারি বরাদ্দের তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দেওয়া অর্থের বিতরণ বিবরণী এবং সম্মানী ছাড়া অন্যান্য খাতে নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ থেকে করা ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত ভোটকেন্দ্র, ভোটকক্ষ ও দুর্গম কেন্দ্রের তালিকা এবং হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পাঠানো দুর্গম কেন্দ্রের মূল প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। দুর্গম কেন্দ্রের প্রস্তাব সংশোধন করা হয়ে থাকলে তার কারণ, অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদিও চাওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন থেকে দুর্গম কেন্দ্র বাবদ পাওয়া অতিরিক্ত ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের কপি এবং সংশ্লিষ্ট তিন উপজেলার ইউএনওদের অতিরিক্ত বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের বিবরণও চাওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত কমিটি কী কী বিষয়ে তথ্য চেয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বরিশালে নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার দৈনিক আমার দেশকে বলেন, ‘সাবেক জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে একটি টিম গত বৃহস্পতিবার বরিশালে এসেছিল। ইতোমধ্যে তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ঢাকায় চলে গেছে। কবে এবং কোন কোন বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে আমি জানি না।’
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সদস্যরা বরিশালে এসে তাদের তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করেছেন। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে তারা ঢাকায় ফিরে গেছেন।’
তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কোন কোন বিষয়ে তদন্ত হয়েছে, তা তিনি জানেন না। না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

