চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বর্ষার টানা বৃষ্টিতে ফিরে এসেছে পাহাড়ি ঝরনার প্রাণ। পাহাড়ের বুক চিরে গর্জন তুলে নেমে আসা ফেনিল জলধারা, ঘন সবুজ অরণ্য, মেঘে মোড়ানো পাহাড় আর শীতল প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো ভ্রমণপিপাসু। সহস্রধারা থেকে রূপসী, নাপিত্তাছড়া হয়ে খৈয়াছড়া পর্যন্ত বিস্তৃত ঝরনাপথ এখন বর্ষার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ট্র্যাকিং ও প্রকৃতি ভ্রমণের কেন্দ্র। বর্ষা শুরু হলেই এখানকার ঝরনাগুলো ফিরে পায় প্রাণ। পাহাড়ি পাথরের গা বেয়ে ধাপে ধাপে নেমে আসা জলধারা, সবুজ বনভূমির নৈসর্গিক পরিবেশ এবং দুর্গম ট্রেইলের রোমাঞ্চ প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হচ্ছে বড়তাকিয়ার পূর্ব পাশে অবস্থিত ৯ ধাপের খৈয়াছড়া ঝরনায়। পাশাপাশি ছোট দারোগারহাটের পূর্বে সহস্রধারা-২, বড় দারোগারহাটের উত্তর-পূর্বে রূপসী ঝরনা, হাদি ফকিরহাটের পূর্বে নাপিত্তাছড়া, সুপ্তধারা, কমলদহ, ছাগলকান্দা, কুপিকাটা খুম ও মিটছড়ির দুর্গম ট্রেইলেও প্রতিদিন ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। ঝরনার প্রবেশপথ ও ট্রেইলসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল ও পর্যটকসেবা কেন্দ্র। স্থানীয় তরুণরা বাঁশের লাঠি, রেইনকোট ও ট্র্যাকিং সরঞ্জাম ভাড়া দেওয়ার পাশাপাশি গাইড, পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ ও লকার সেবার মাধ্যমে আয় করছেন। এছাড়া পাহাড়ি আনারস, ডাব, লটকন, পেঁপে ও বাঁশকোড়ল বিক্রি করেও অনেক পরিবারের জীবিকায় এসেছে স্বস্তি।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্থানীয় গাইড, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং আশপাশের বাসিন্দারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ঝরনাকেন্দ্রিক পর্যটন ইতোমধ্যে অনেক তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং ইজারাদার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রেইল ত্যাগের নির্দেশনা, নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ তরুণদের গাইড হিসেবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন ঝরনার ইজারাদার অহিদুল ইসলাম শরীফ চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ছোট দারোগারহাট এলাকার সহস্রধারা-২ থেকে বড় দারোগারহাটের রূপসী ঝরনা হয়ে খৈয়াছড়া পর্যন্ত অনেকগুলো ঝরনা রয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক এসব ঝরনা দেখতে আসছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ঝরনাগুলোতে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি সতর্কতামূলক ব্যানার, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড এবং পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
উপজেলার বারৈয়াঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল আমার দেশকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি ঝরনাগুলো দেখতে আসেন। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ভারী বৃষ্টি বা সতর্ক সংকেত জারি হলে পাহাড়ি ঝরনাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সে সময় বন বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি ও তদারকির পাশাপাশি ইজারাদার কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় নিরাপত্তাকর্মী, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিবেশবিদ ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, সীতাকুণ্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ করেই পর্যটনের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পর্যটকের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত গাইড নিয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সহস্রধারা থেকে খৈয়াছড়া পর্যন্ত বিস্তৃত ঝরনাগুলো দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম অঞ্চলে পরিণত হবে এবং জাতীয় পর্যটন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

