চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালের নাম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিকে বিদেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া ফের জোরেশোরে শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার পর দরপত্র মূল্যায়ন ও নেগোসিয়েশন কমিটি গঠনের অনুমোদন চেয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এই ইস্যুতে তীব্র আন্দোলন হয় বন্দরে। শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠনসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা সবাই একাট্টা হয়ে বন্ধ করে দেন বন্দরের কার্যক্রম। বাধ্য হয়ে চুক্তি প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দেয় তখনকার সরকার। তিন মাস পর নতুন করে একই প্রক্রিয়া আবার শুরু হলেও তখনকার আন্দোলনকারীরা এখন চুপ, যা নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে।
তবে সম্প্রতি বিএনপি সরকারের দুজন এমপির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও এনসিটির সাবেক অপারেটর মিলে তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম যৌথভাবে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ প্রস্তাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে বন্দরকে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যৌথ কনসোর্টিয়ামের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—জাতীয় সংসদের বিএনপিদলীয় হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজানের কসমস এন্টারপ্রাইজ, শাহাদাত হোসেন সেলিমের এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ও তরফদার রুহুল আমিনের সাইফ পাওয়ারটেক। নতুন এ প্রস্তাবনায় যেহেতু ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে বেশি সুযোগ-সুবিধা বন্দরকে দেওয়া হয়েছে, তাই এ নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। যদিও এ ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিটি বর্তমানে এমন পর্যায়ে আছে, সেখানে নতুন কোনো প্রস্তাবনা বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
টার্মিনালটি বর্তমানে নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড পরিচালনা করছে। এর আগে বন্দরের ব্যবস্থাপনায় দেশীয় অপারেটর প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক টার্মিনালটি পরিচালনা করত। গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনলার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই। কিন্তু সে সময় শ্রমিক-কর্মচারী কিংবা বন্দর ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক এ চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় আন্দোলন। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতৃত্বে আন্দোলনে একাট্টা হয় বাম দল ও শ্রমিকদের সংগঠন স্কপসহ বিভিন্ন সংগঠন। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বন্দরে স্থবিরতা নেমে আসে। বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দিলে নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে—এমন অজুহাতে অচল করে দেওয়া হয় বন্দরের মতো জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে।
কথিত আন্দোলনে টানা ছয়দিন পুরোপুরি বন্ধ থাকে বন্দরের কার্যক্রম। আন্দোলন থামাতে তৎকালিন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রামে এসেও শ্রমিক দল নেতাদের মন গলাতে পারেননি। অবশেষে এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তী সরকার। তিন মাস পর বিএনপি সরকারও এনসিটি অপারেশনের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিটি শনিবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার কাজ দেওয়ার বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বলেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অন্য একটি চিঠিতে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ‘চলমান নেগোসিয়েশন’ নিয়ে আরেকটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাতে দুবাইভিত্তিক এই কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া অথবা ‘এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের’ নির্দেশনা ছিল। কিন্তু একদিন পর পাঠানো দ্বিতীয় চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪ জুন সভা হয়। “সভার আলোচনা মোতাবেক উক্ত প্রকল্পে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের লক্ষ্যে ‘নেগোসিয়েশন’ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”
চিঠিটি হাতে পাওয়ার দিনই পিপিপি পদ্ধতিতে টার্মিনালটি পরিচালনার লক্ষ্যে চলমান দরপত্র মূল্যায়ন ও নেগোসিয়েশন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সাত সদস্যের নতুন কমিটি গঠনের অনুমোদন চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তার মানে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া ফের জোরেশোরে শুরু করেছে সরকার।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এরপর থেকে এনসিটিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সবশেষ গত মে মাসে এক লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়, যা এনসিটিতে এক মাসের হিসাবে সর্বোচ্চ। চট্টগ্রাম বন্দরের চালু থাকা চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ হয় এই একটি টার্মিনাল থেকে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর অধীন এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাঝখানে জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ায় সাময়িক সময়ের জন্য থমকে যায় এনসিটিতে অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া। অর্ন্তবর্তী সরকারের মেয়াদে আবার এ প্রক্রিয়া গতিশীল হয়। ওই সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তি হয়ে যাওয়ার জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যান বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। আর ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে পরিচালিত স্কপ নামে দুটি সংগঠন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাম রাজনৈতিক দলগুলো। বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও ওই আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে আন্দোলনে অচল করে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে। টানা ছয়দিন অচল রাখা হয় বন্দরের কার্যক্রম। ৮ ফেব্রুয়ারি বাধ্য হয়ে এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দেয় অর্ন্তবর্তী সরকার। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্ল্যাটফর্মের সভায় আবার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই সভায় এনসিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে সমন্বিত টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড। এরপর এপ্রিলের শেষদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ওই প্রস্তাবের বিষয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে মতামত জানতে চায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সবশেষ গত শনিবার মন্ত্রণালয়ের দেওয়া চিঠিতে স্পষ্ট করে নির্দেশ দেয়া হয় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অপারেটর প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে। এরপর জোরেশোরে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনগুলো এবার মুখে কুলুপ এঁটেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী জানান, এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে সক্ষম একটি টার্মিনাল। টার্মিনালটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকার শুরু করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারেরও আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। বর্তমান বিএনপি সরকারও এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে তৎপর। আসলে এর পেছনের কারণ কী? একটি বিষয়ে তিন তিনটি বিপরীতমুখী সরকার একমত হয়েছে, অতীতে এমন কোনো প্রকল্প বা চুক্তি দেখানো যাবে না। কিন্তু এনসিটির ক্ষেত্রে যারাই ক্ষমতায় আসছে, তারাই বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে। এটা রহস্যজনক। মাত্র তিন মাস আগে যারা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যেসব কারণ দেখিয়ে বন্দর অচল করে দিয়েছিলেন, সে কারণগুলো এখনো বর্তমান। যারা আন্দোলন করেছিলেন, নির্বাচনের পর তাদের শক্তি-সামর্থ্য আরো বেড়েছে কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারাও চুপ হয়ে গেছেন। বিষয়টি সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। সরকারের উচিত এনসিটি নিয়ে সুস্পষ্ট একটি ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরা।
এসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শ্রমিক দল নেতা ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির জানান, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের শক্ত অবস্থান এখনো আছে। পুরো বিষয়টি তুলে ধরে আমরা সরকারের কাছে একটি চিঠি দিচ্ছি। সরকার যদি আমাদের মেসেজ বুঝতে না পারে, তাহলে আন্দোলন শুরু হবে। যে দলই সরকারে থাকুক, দেশের স্বার্থে বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র রুখে দিতে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারী তথা চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামবেন বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শূন্য রানেই নেই ৩ উইকেট, মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার অবিশ্বাস্য বিপর্যয়