বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কনিষ্ঠ শহীদদের একজন হাফেজ মোনায়েল আহমেদ ইমরানের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী মঙ্গলবার তার নিজ বাড়িতে পালিত হয়েছে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচার, দায়ীদের জবাবদিহি এবং শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার স্বজনেরা। একই সঙ্গে তারা অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকার গ্র্যান্ড চাঁদনী রেস্তোরাঁ-সংলগ্ন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয় মাত্র ১৬ বছর বয়সি মাদরাসাশিক্ষার্থী হাফেজ মোনায়েল আহমেদ ইমরান।
পরিবার ও সহযোদ্ধাদের অভিযোগ, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পথে পুলিশের বাধার কারণে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ইমরান হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কৃষক ছোয়াব মিয়ার ছেলে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, আন্দোলনে যাওয়ার আশঙ্কায় সেদিন সকালে তাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুপুরে চিপস কেনার কথা বলে কৌশলে ঘর থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। বেলা প্রায় পৌনে ৩টার দিকে হেলমেট পরিহিত এক পুলিশ সদস্যের ছোড়া রাইফেলের গুলি তার পিঠ ভেদ করে বুক দিয়ে বেরিয়ে যায়। সহপাঠী ও আন্দোলনকারীরা তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রায়েরবাগ এলাকায় পুলিশ প্রায় আধা ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে। এ সময় সঙ্গে থাকা কয়েকজন আন্দোলনকারীকে মারধর করা হয় এবং তাদের মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়। পরিবার মনে করে, এই বিলম্বই ইমরানের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
শহীদ ইমরানের মা ইয়াসমিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পুলিশ যদি সেদিন অ্যাম্বুলেন্সটা আটকে না রাখত, হয়তো আমার ছোট ছেলেটা আজ বেঁচে থাকত। দেশের জন্য আমার ছেলে জীবন দিয়েছে, কিন্তু আজও আমরা তার মৃত্যুর বিচার পাইনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী তাদের পরিবারের খোঁজ নিতে আসেননি। তার ভাষায়, ছেলের শাহাদাতের সময় অনেকেই পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।
শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা, সম্মান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আজও অনিশ্চয়তায় আছি ইমরানের পরিবার বলছে, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা, আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে ইমরানের কবর জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। লাখাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি আক্তার আহাদ চৌধুরী স্বপন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা, যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের দাবি বাস্তবায়নে আমরা সবসময় সোচ্চার থাকব।
জামায়াতে ইসলামীর লাখাই উপজেলা সভাপতি লুৎফুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহীদ পরিবারের পাশে থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতেও তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, শহীদদের আত্মত্যাগ কেবল স্মরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দায়ীদের জবাবদিহি এবং শহীদ পরিবারের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই তাদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

