চট্টগ্রামে আবার তীব্র হয়ে উঠেছে গ্যাস সংকট। কোথাও নিভুনিভু করে চুলা জ্বলছে। আবার কোথাও গ্যাসের দেখা নেই একেবারেই। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে আসায় উৎপাদনে ভাটা পড়েছে পোশাককারখানা থেকে শুরু করে জাহাজ ভাঙা শিল্প ও ইস্পাত তৈরির কারখানায়। নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোনো কোনো স্টেশন গ্যাস প্রদান সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
একইসঙ্গে যোগ হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি। বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাহিদার তুলনায় গ্যাস মিলছে প্রায় অর্ধেক। এতে নাগরিকদের নিত্য জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নগরবাসীর অভিযোগ, জুলাইয়ের শেষ দিকে গ্যাস সংকট দেখা দিলেও এখনো সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। তাছাড়া প্রতিদিনই লোডশেডিং বাড়ছে। এই দুইয়ে এখন হাঁফিয়ে উঠেছেন নগরীর বাসিন্দারা। অথচ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ বা অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বলছে, বর্তমানে চাহিদার ৫৪. ২৯ শতাংশ গ্যাস মিলছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। অর্থাৎ ৪৫.৭১ শতাংশ গ্যাস মিলছে না। তাদের আওতাভুক্ত এলাকায় দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা সাড়ে তিনশ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে দৈনিক বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। কখনো কখনো ২১০-২২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও তা চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
গ্যাসসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদা মূলত অবকাঠামোগত। এই অঞ্চলের চাহিদা মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। দেশের অন্যান্য জেলার মতো প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রামে চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মহেশখালীর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট এলএনজি। দুটি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিক সময়ে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। এই দুটি টার্মিনাল অপারেশনে না থাকলে সংকট হয়, চালু থাকলে গ্যাস স্বাভাবিক থাকে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নি-দুর্ঘটনার ফলে গ্যাস সংকটের উদ্ভব হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে কয়েকদিন সরবরাহ স্বাভাবিক দেখা গেলেও এখন আবার সংকট দেখা দিয়েছে।
কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটির একটি বয়লার আংশিকভাবে চালু হলে গ্যাস সরবরাহের চাপ কিছুটা বাড়ে। তবে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ ও ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবস্থার মেরামত এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের প্রতিস্থাপন অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে আবার নগরে ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং পার্বত্য এলাকায় গ্যাসের সংকট হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, দুটি টার্মিনাল থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ঢোকার পর সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় বণ্টন হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে সংকট কাটবে না। চট্টগ্রামের মূল চাহিদা ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে কমপক্ষে সাড়ে তিনশ মিলিয়ন ঘনফুট
চট্টগ্রামে ফের তীব্র হচ্ছে গ্যাস সংকট, চাহিদার ৪৬% ঘাটতি
: শেষ পৃষ্ঠার পর
প্রয়োজন হয়। চাহিদার অনুপাতে বরাদ্দ না থাকায় গ্রাহকরাও ভোগান্তিতে পড়েন।
এদিকে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় নগর ও নগরের বাইরে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিত্যদিনের রান্না, যানবাহনের গ্যাস নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন অনেকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের অতিরিক্ত লোডশেডিং।
নগরের আকবরশাহ এলাকার বাসিন্দা আয়শা আক্তার বলেন, প্রতিদিন অন্তত ১০ বার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার যখন লোডশেডিং হয়, কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পর চালু হয়। তাছাড়া সকাল হলেই গ্যাস থাকে না। বলতে গেলে দৈনন্দিন জীবনে আমরা হাঁফিয়ে উঠেছি।
নগরের মুরাদপুরের বাসিন্দা কুলসুম আক্তার বলেন, চুলায় গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারের গ্যাস কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এতে সংসারের খরচ বাড়ছে।
গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানার উৎপাদন ও পরিবহন খাতে। রড উৎপাদন, পোশাক কারখানা, জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ড, ক্যাপ্টিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট, স্টিল স্ট্রাকচার কারখানার উৎপাদন ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্পকারখানার নিজস্ব ক্যাপ্টিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ২২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট।
বর্তমানে রাউজান আনোয়ারাসহ একাধিক ২১০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট বন্ধ রয়েছে। বুধবার কোনো কোনো কারখানায় গ্যাস না থাকায় পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, গ্যাসের এই সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন যেমন বন্ধ থাকবে তেমনি খরচও বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে বাজারে। কারণ কারখানা বন্ধ থাকলেও খরচ থেমে থাকে না। এতে তারা বড় অঙ্কের লোকসানে পড়ছেন।
বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত বলেন, বুধবার থেকে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আমাদের ব্যবসায় বলতে গেলে মন্দাভাব বিরাজ করছে গত এক মাস ধরে। কারণ ২০ দিন ধরে আমরা গ্যাস কাঙ্ক্ষিত হারে পাচ্ছি না। আগে থেকে চলা সংকটের কারণে দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৮০ শতাংশ হারে পূরণ হচ্ছিল। এভাবে চলতে থাকলে বড় লোকসানে পড়ব। গ্যাস ছাড়া কারখানা চালু রাখা মূলত অসম্ভব।
বুধবার নগরের সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ছিল দীর্ঘ সারি। গ্যাস সংগ্রহ করতেই পুরোদিন কেটেছে কারো কারো। এতে সড়কে অপেক্ষাকৃত কম যানবাহন চলাচল করছে। যানবাহন সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। সিএনজি স্টেশনগুলোর মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকলে তারা গ্যাস প্রদান বন্ধ রাখেন। চাপ যখনই ভালো হয়, তারা সরবরাহ চালু করেন।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। দৈনিক বরাদ্দ ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও মিলছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। আমরা সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
সম্পাদনা: কামরুল
রিপোর্ট: এম কে মনির, চট্টগ্রাম
০১৩১৭৬৬১২৯৪
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

