জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি, সীমিত নাগরিকসুবিধা আর অবকাঠামোগত সংকটকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামের মানুষ। কিন্তু সরকারের এক ঘোষণায় সমুদ্র উপকূলীয় এই জনপদে মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ আগামী ১০ আগস্ট টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পানখালী গ্রাম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করবে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দেশের তিনটি গ্রামকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে পানখালীর পাশাপাশি রয়েছে, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়ি এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর গ্রাম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনটি গ্রামের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নের আলোকে পানখালী গ্রামকে একটি আধুনিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দারিদ্র্যবিমোচন, জলাবদ্ধতা নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন, নারীর ক্ষমতায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, কৃষি ও জীবিকার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সম্প্রতি খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল্লাহ হারুন গ্রামটি পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এর আগে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক আরিফুল ইসলামও পানখালী গ্রাম পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।
গ্রামবাসীর প্রত্যাশা, এসডিজি ভিলেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা দূর হবে। কৃষক মাহবুবুর রহমান ও জেলে পরিমল রায় বলেন, তাদের গ্রামের উন্নয়নের স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, কৃষির আধুনিকায়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের মাধ্যমে পানখালীর মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
উদ্বোধন উপলক্ষে স্থানীয় মমতাজ বেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এক হাজারের বেশি আমন্ত্রিত অতিথি এখানে উপস্থিত থাকবেন। ইতোমধ্যে সুবিশাল মঞ্চ ও প্যান্ডেল স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের জন্য ঢাকা থেকে টেকনিশিয়ানরা এসেছেন। স্থানীয়ভাবেও ব্যাকআপ রাখা হচ্ছে। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক। খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ঢাকায় মূল অনুষ্ঠানস্থলে থাকবেন।
পানখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রামবাসী কখনো কল্পনা করেননি, তাদের গ্রাম জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি উন্নয়ন উদ্যোগের অংশ হবে। উদ্বোধনের অপেক্ষায় এখন পুরো গ্রাম আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর।
পানখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সাব্বির আহম্মেদ বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে পানখালী একটি আধুনিক ও টেকসই গ্রামে পরিণত হবে।
পানখালী গ্রামকে বেছে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান। তিনি বলেন, উপকূলীয় এ গ্রামের মানুষ সব ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করে জীবন ধারণ করে। তাদের সামনে এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন হতে যাচ্ছে। এটি সরকারের একটি মডেল প্রকল্প, যা পরবর্তী সময়ে সারা দেশে বাস্তবায়িত হবে।
পাঁচ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পানখালী গ্রামের লোকসংখ্যা চার হাজার ৩৯৭ জন। ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। গ্রামে সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৭০ ভাগ। গ্রামে চাষযোগ্য জমি ৫০০ হেক্টর। ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ স্লোগান ধারণ করে পানখালী গ্রামের মডেল প্রোডাক্ট হিসেবে কাঁকড়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


