ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থপাচার করেছে, এমন ৪২টি ঋণখেলাপি গ্রুপকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির প্রায় ২২ কোটি ডলার পাচারের তথ্য শনাক্ত করা গেছে। পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। ইতোমধ্যে বিদেশে থাকা সম্পদ চিহ্নিত ও জব্দ করার জন্য আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
জানা গেছে, ৪২টি গ্রুপের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা প্রায় ২.৫৫ বিলিয়ন ডলার। ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা।
৪২টি গ্রুপের মধ্যে অন্যতম হলো—এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ ও সাদ মুসা গ্রুপ। এরমধ্যে এসবি এক্সিমের দুই কোটি ৬৮ লাখ ডলার, হাবিব গ্রুপের ১৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার, ইয়াসীর গ্রুপের প্রায় চার কোটি ডলার এবং এডব্লিউআর গ্রুপের প্রায় দুই কোটি ডলার পাচারের তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। চার প্রতিষ্ঠানের মোট পাচার করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার শীর্ষ ১১টি গ্রুপের ব্যাংক লুট, অর্থপাচার, কর ফাঁকি ও অন্যান্য অনিয়ম-জালিয়াতি খুঁজে বের করতে যৌথ তদন্তদল গঠন করে। পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং আলোচিত ১০টি শিল্প গ্রুপের দেশ-বিদেশে থাকা মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এসব শিল্প গ্রুপ হলো—এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ এবং আরামিট গ্রুপ।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) যৌথ তদন্তের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিদেশি সম্পদ উদ্ধারে গ্র্যান্ট থর্নটন, বেকার ম্যাকেঞ্জি, পিডব্লিউসি ও ডেলয়েটের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সহায়তা করছে।
দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ডেটাবেজের তথ্যানুযায়ী, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে পাচার করা সম্পদ খুঁজে বের করতে আটটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেল্লি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা ঋণখেলাপিদের সম্পদের অবস্থান, ধরন ও পরিমাণ শনাক্ত করছে এসব প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট দেশের আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো অগ্রিম ফি বা খরচ নেবে না। তারা বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলে উদ্ধার করা অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে। অর্থাৎ ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায় এই ৪২টি প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এসব দেশ থেকে পাচারের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে আগে থেকে ১১টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কাজ করছিল বিএফআইইউ। এখন এর সঙ্গে আরো ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো ঋণখেলাপি এবং তারা ঋণ পরিশোধ করছে না। তাই তাদের অর্থের একটি অংশ বিদেশে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক বা অর্থের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করতে বিদেশি সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছে। বিদেশে অর্থের সন্ধান পাওয়া গেলে তা ফ্রিজ করে দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিষয়টির অগ্রগতি নিয়ে গতকাল রোববার বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে ৩৮টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে গভর্নর পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম আরো জোরদারের তাগিদ দেন।
বৈঠক শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। এ অর্থ ফেরত আনতে ব্যাংকগুলো কাজ করছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পাচার হওয়া কত অর্থ ফেরত আনা যাবে, সেটি পরের বিষয়। তবে যারা অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত, তারা যেন শাস্তি পায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য বিদেশে তাদের থাকা অর্থ ফ্রিজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ কাজে বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও আর্থিক পরিমাণ শনাক্তের কাজ করছে। সম্পদ চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইনানুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় প্রথমে তা ফ্রিজ বা জব্দ করার ব্যবস্থা করা হবে। পরে আদালতের নির্দেশে সেসব সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন পাচার করা জাতীয় সম্পদ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের অনাদায়ী বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণও আদায় করা সম্ভব হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


