বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। মঙ্গলবার সই হওয়া এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অপরদিকে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৫৪টি পণ্যে একই সুবিধা ভোগ করবে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে, যেখানে বাংলাদেশের বাজারে কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য একই ধরনের সুবিধা লাভ করবে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবে চুক্তিটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এটি নতুন করে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ৪২ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৮৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২০ কোটি ডলার, যা মোট রপ্তানির ৪৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নিট পোশাক থেকে এসেছে ১৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা মোট আয়ের ৩৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
ইপিবির তথ্যে আরো দেখা যায়, পোশাকের বাইরে তামাক ও তামাকজাত বিকল্প পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ডলার। এছাড়া জুতা ও এর যন্ত্রাংশ ১ কোটি ২২ লাখ ডলার, উদ্ভিজ্জ তন্তু ও পেপার ইয়ার্ন ৫৭ লাখ ডলার, চামড়াজাত পণ্য, হ্যান্ডব্যাগ ও স্যাডলারি ৪৬ লাখ ডলার এবং অন্যান্য তৈরি টেক্সটাইল সামগ্রী থেকে আয় হয়েছে ৩১ লাখ ডলার। বাকি বিভিন্ন পণ্য থেকে এসেছে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ ডলার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হয় প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের বাণিজ্য সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা গতি হারিয়েছে, তার মধ্যেই সিইপিএ কার্যকর হয়েছে। ফলে চুক্তিটি কেবল বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগই তৈরি করেনি, বরং কমে যাওয়া রপ্তানি প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া বছরে প্রায় ১২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক আমদানি করে। বৈশ্বিক পোশাক আমদানির প্রায় ৩ শতাংশ এই দেশটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে এত বড় বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হলো কোরিয়ার উচ্চমূল্যের ফ্যাশনপণ্যের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রচলিত বা সাধারণ ধরনের পোশাক উৎপাদনের অমিল। এর মধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের শক্ত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জন্য বাজার সম্প্রসারণ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জর হয়নি। এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামোর অভাবও অন্যতম।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, সিইপিএ কার্যকর হলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন গতি আসবে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রত্যাশা করে আসছিলেন। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশের কিছু পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও অনেক পণ্যে আমদানি শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সব ধরনের পোশাক একই সুবিধার আওতায় আসবে। এতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। বিপরীতে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক আমদানি করে। তাই সিইপিএর সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর পাশাপাশি পণ্য সরবরাহের সময় কমানো গেলে দক্ষিণ কোরিয়ার এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



