ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান, সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ ও আলোচনার প্রস্তাবÑসব কৌশল ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় ক্রমেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ইরানের নেতৃত্ব ও ক্ষমতার কাঠামো বুঝতে তার সীমাবদ্ধতারই প্রতিফলন।
গত সোমবার ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আচরণে তেহরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের কপটতা’ দেখাচ্ছে। এমন মন্তব্যকে ইরানি নেতাদের মনোভাব ও কৌশল বুঝতে তার ব্যর্থতার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং তাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে দক্ষ বলে নিজেকে দাবি করলেও ইরানের নেতারা ট্রাম্পকে বারবার হতবিহ্বল করে দিচ্ছেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছে।’
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের সঙ্গে যেকোনো সময় সমঝোতার আশা প্রকাশ করলেও তেহরান এখনো ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের অবস্থানে অনড় রয়েছে। ট্রাম্প এ অবস্থানকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে অর্থবহ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী ভোটাররাই হতাশ হবেন না, হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরো বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভোক্তাদের ওপর।
তবে শুধু ট্রাম্পই নন, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টই ইরানের ক্ষমতার কাঠামো ও নেতৃত্বের মানসিকতা সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রায় ২০ মাসের দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। রিপাবলিকানদের পাশাপাশি নিজ দলের কিছু ডেমোক্র্যাটের বিরোধিতা সত্ত্বেও ওবামা চুক্তিটি সম্পন্ন করেন এবং এটিকে নিজের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন।
ইরান বিষয়ে কয়েক দশক ধরে গবেষণা করা সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক কেনেথ পোলাক বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এমন একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, যিনি ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন।
পোলাকের ভাষায়, বহু দিক থেকেই ট্রাম্প ইরানকে ঘিরে আমেরিকার দীর্ঘদিনের হতাশার প্রতীক। তিনি যেমন ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, তেমনি ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি দেখেছেন, এ দুই পথের কোনোটিই তাকে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারেনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণ যেন নিজেদের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।
যুদ্ধের সময় ইরানের আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও নিহত হন। তবে ট্রাম্পের প্রত্যাশার বিপরীতে দেশটিতে কোনো গণঅভ্যুত্থান ঘটেনি। বরং ইরানের বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো অটুটই রয়েছে, যা তেহরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

