আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রোববার (২১ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই সাক্ষ্য প্রদান করা হয়। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে কীভাবে গুম করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন সে সময়ের র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালকের ‘রানার’ ও সেনা সদস্য ইমরুল কায়েস। একই সাথে জিয়াউল আহসানের ভারত-বাংলাদেশজুড়ে বিস্তৃত এক ‘কিলিং নেটওয়ার্ক’ এবং বিডিআর সদস্যদের হত্যার বিষয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে তার সাক্ষ্যে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রোববার (২১ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই সাক্ষ্য প্রদান করা হয়। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস জানান, ২০০১ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব সদর দপ্তরে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি তৎকালীন র্যাব ইন্টেলিজেন্স পরিচালক জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ হিসেবে নিয়োগ পান।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইমরুল বলেন, “২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল র্যাব সদর দপ্তর থেকে মেজর জিয়াউল, মেজর নওশাদ ও সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। কাকে গাড়িতে তোলা হবে তা আমি জানতাম না। তবে গাড়িতে বসে জিয়াউল স্যার বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ‘টার্গেট কখন আসবেন’ সে বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে জানা যায় টার্গেট আসবেন না। পরে স্যারকে বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন আমি ৯ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাই।”
তিনি আরও বলেন, “ছুটিতে থাকাকালে ১৮ এপ্রিল জানতে পারি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ২৩ এপ্রিল কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর দেখি পুরো র্যাব সদর দপ্তরে থমথমে পরিবেশ। একদিন জিয়াউল স্যার ফোনে কথা বলছিলেন। এর মধ্যে তার আরেকটি ফোনে কল আসে। তখন তিনি পাশের লোকটিকে বলেন— 'তুই রাখ। তারিক স্যার ফোন দিয়েছেন'।”
সেনা সদস্য ইমরুল ট্রাইব্যুনালকে বলেন, “ফোনে তারিক স্যারের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার একপর্যায়ে জিয়াউল স্যার উচ্চস্বরে বলে ওঠেন— ‘আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দিন।’ এছাড়া ইলিয়াস আলীকে গুমের পর র্যাব সদর দপ্তরের বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল স্যার নিজ হাতে ধ্বংস করে ফেলেন।”
সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, “জিয়াউল আহসানের কিলিং নেটওয়ার্ক ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। সাক্ষী আজ ট্রাইব্যুনালে ‘জাফলং অপারেশন’ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। র্যাবের টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামিকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে জাফলংয়ে গিয়েছিলেন সাক্ষীসহ অন্যরা। সেখানে ভারত থেকে আসা সাদা পোশাকের কিছু লোক আরও দুজন ব্যক্তিকে নিয়ে আসে। এরপর আসামিদের বিনিময়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়।”
চিফ প্রসিকিউটর সাক্ষীর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেন, “ভারত থেকে আনা ওই দুই ব্যক্তিকে রাস্তার মাঝেই মাথায় গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল আহসান। ভারত থেকে আসা ওই ব্যক্তিরা কারা ছিল এবং নিহতরা কোন দেশের নাগরিক তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে জিয়াউলের এই নেটওয়ার্কে ভারতের কিছু লোক বা বাহিনীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।”
বিডিআর বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে বিডিআর সদস্যদের হত্যার বিষয়েও সাক্ষীর জবানবন্দিতে তথ্য এসেছে। আমিনুল ইসলাম জানান, “জিয়াউল আহসান বিডিআরের অন্তত ১০-১২ জন সদস্যকে ধরে এনে দুটি পদ্ধতিতে হত্যা করেছেন। কাউকে ইনজেকশন পুশ করে আবার কাউকে মাথায় গুলি ঠেকিয়ে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।”
রোববার সকালে কড়া নিরাপত্তায় জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং তার উপস্থিতিতেই এই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, এই মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে। এ সময় আদালতে প্রসিকিউশন টিমের সদস্য এবং বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


