স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর যথাযথভাবে কাজ করা আবশ্যক। এগুলো যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তখন রোগ নির্ণয়ের জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু এই রোগ নির্ণয় বা শরীর পর্যবেক্ষণের কাজটি যদি ঘরের মধ্যে, কোনো ব্যথা বা ঝামেলা ছাড়াই নিয়মিতভাবে করা যায়-কেমন হবে ভাবুন তো?
হ্যাঁ, আগামী দিনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমনই এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি আসতে চলেছে। চিকিৎসকরা এখন দূরে বসেই রোগীর শরীরের সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নিতে পারবেন ‘ইলেকট্রনিক স্কিন’ বা ‘ই-স্কিন’র (E-Skin) মাধ্যমে। ই-স্কিন হলো ত্বকে লাগিয়ে রাখার মতো অত্যন্ত পাতলা, হালকা ও নমনীয় এক ধরনের পরিধানযোগ্য (Wearable) সেন্সর। সম্প্রতি জাপানের গবেষকরা এটি তৈরি করেছেন, যা সামান্য ‘ওয়াটার স্প্রে’ বা জলীয় বাষ্প ব্যবহার করে বুকের কাছে বা হাতের পেছনে স্টিকারের মতো লাগিয়ে রাখা যাবে। একটি ই-স্কিন টানা এক সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। এই যুগান্তকারী প্রযুক্তির উদ্ভাবক জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টাকাও সোমেয়া (Takao Someya)।
‘পলিভিনাইল অ্যালকোহল’ নামক বিশেষ নমনীয় উপাদান দিয়ে এই ই-স্কিন তৈরি করা হয়েছে, যার ওপর থাকে স্বর্ণের (Gold) একটি অতিসূক্ষ্ম স্তর। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ছোট্ট একটি তারহীন (Wireless) ট্রান্সমিটার। এই ট্রান্সমিটারটি রোগীর হৃৎস্পন্দন ও অন্যান্য শারীরিক তথ্য নিকটস্থ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা সরাসরি ক্লাউড সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়। বিশেষ সফটওয়্যার সেই তথ্যগুলোকে স্ক্রিনে দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে একজন চিকিৎসক মাইলের পর মাইল দূরে বসেও মুহূর্তের মধ্যে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
ই-স্কিনের চারটি মূল বৈশিষ্ট্য
১. উচ্চ নমনীয়তা : এটি মানুষের আসল ত্বকের মতোই অত্যন্ত নমনীয়। ফলে শরীরের যেকোনো অংশে এটি সহজে মানিয়ে যায় এবং যেকোনো দিকে বাঁকানো সম্ভব।
২. উচ্চ রেজল্যুশন : মানবদেহের যেকোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তন, স্পন্দন বা সংকেত এটি নিখুঁত ও স্পষ্টভাবে ধরতে পারে।
৩. উচ্চ সংবেদনশীলতা : অতি সামান্য ছোঁয়া, মৃদু চাপ কিংবা সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রতিও এই স্কিন অত্যন্ত সংবেদনশীল।
৪. বৃহৎ পরিসর : এই ই-স্কিন দেহের বড় অংশজুড়ে ব্যবহারের জন্য বিশাল আকারেও তৈরি করা সম্ভব।
ই-স্কিনের কার্যক্ষমতা
* স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ : গলার কাছে বা ত্বকে সেন্সর লাগিয়ে শরীরের ভেতরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ২৪ ঘণ্টা সরাসরি ট্র্যাক করা সম্ভব।
* কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল করা : কৃত্রিম হাত বা পায়ে এই ই-স্কিন ব্যবহারের মাধ্যমে অচল বা কৃত্রিম অঙ্গেও ছোঁয়া, ঠান্ডা কিংবা গরমের অনুভূতি ফিরিয়ে আনা যাবে।
* শরীরের ভেতরে প্রতিস্থাপন : এই ডিভাইস শুধু বাইরেই নয়, শরীরের ভেতরে লিভার বা হার্টের সঙ্গে এই ডিভাইস যুক্ত করে ভেতরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
* বায়োমেডিকেল ও তারহীন প্রযুক্তি : রক্তচাপসহ নানা বায়োমেডিকেল ডেটা কোনো সম্পূর্ণ তারহীন প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো যাবে।
* তাপমাত্রা পরিমাপ : শরীরের তাপমাত্রা প্রতি মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে মাপা যায়।
হিউম্যান-মেশিন ইন্টারঅ্যাকশন
* মানুষ ও যন্ত্রের সরাসরি যোগাযোগ : মানুষ এবং কম্পিউটারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে এই স্কিন।
* চাপের মানচিত্র ও বল পরিমাপক : হাতের ওপর কতটা বল বা চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা গ্রাফের মাধ্যমে সহজেই নিখুঁতভাবে মেপে ফেলা যাবে।
* ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লে : ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লের মাধ্যমে মানুষের ত্বকের ওপর সরাসরি আলো ফেলে বা রঙের পরিবর্তনের সাহায্যে তথ্য প্রদর্শন করা যাবে।
* স্বয়ংক্রিয় নিরাময় ক্ষমতা : এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ই-স্কিন কোনো কারণে কেটে বা ছিঁড়ে গেলে তা মানুষের আসল ত্বকের মতোই নিজে নিজে জোড়া লেগে ঠিক হয়ে যেতে পারে।
* ডিজিটাল স্বাক্ষর : হাতের আঙুলে থাকা ই-স্কিনের মাধ্যমে বাতাসে বা যেকোনোভাবে হাত ঘুরিয়েই স্বাক্ষর করা সম্ভব।
* সমন্বিত সার্কিট ও চৌম্বকীয় সেন্সর : ত্বকের আবরণের ভেতরে অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক সার্কিট এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বোঝার সেন্সর যুক্ত করা যায়।
যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারেন না (যেমন অনেক বয়োবৃদ্ধ মানুষ), তাদের জন্য ই-স্কিনের মনিটর স্ক্রিনে সরাসরি সাধারণ ‘ইমোজি’র (Emoji) মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকবে, যা দেখে সহজেই তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা বোঝা যাবে। দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম বা চলাফেরায় কোনো রকম ব্যাঘাত না ঘটিয়েই যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে এটি মানুষের শরীরের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটকে মানুষের মতো স্পর্শের অনুভূতি দেওয়া থেকে শুরু করে মেটাভার্স, সাইবারনেটিকস এবং মানুষ ও যন্ত্রের সরাসরি যোগাযোগে (Human-Machine Interaction) এটি প্রধান হাতিয়ার হবে। ত্বকের ওপর ডিজিটাল ডিসপ্লে, বাতাসে অদৃশ্য স্বাক্ষর কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জোড়া লাগার মতো অবিশ্বাস্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে ই-স্কিন আগামী দিনে স্বাস্থ্যসেবা ছাড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির এক নতুন ও বৈপ্লবিক দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

