প্রায় ২শ সুপারিশ সংবলিত স্বাস্থ্যখাত সংস্কার প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে এ খাতের কমিশন। যেখানে হোমিও, ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক চিকিৎসা বিষয়ে নানা প্রকার আপত্তিজনক তথ্য ও প্রস্তাবনার অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইউনানী অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বুয়ামা)।
সোমবার সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বুয়ামার সভাপতি ডা. তাওহিদ আল বেরুণী ও মহাসচিব ডা. মো. মঈন উদ্দিন এই প্রতিবাদ জানান।
বুয়ামা বলছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকটের মূল কারণ স্বাস্থ্য সেবার অপ্রতুলতা, দুর্বল মান এবং গোষ্ঠী, অঞ্চল ও লিঙ্গভেদে ব্যাপক বৈষম্য দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রকট সংকট তৈরি করেছে বলে সংস্কার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অথচ এই সংকট নিরসনে ও বৈষম্য দূরীকরণে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে হোমিও, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক খাতের কোন প্রতিনিধি রাখা হয়নি। উপরন্তু কমিশন বিভিন্ন অংশীজনের সাথে মতবিনিময় করলেও দেশের স্বাস্থ্য সেবায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনকারী হোমিও, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ, বোর্ড, কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের থেকে মতামত নেওয়া হয়নি। যার ফলে স্বাস্থ্য খাতের একটি বিরাট অংশের প্রতিফলন এই প্রতিবেদনে উঠে আসেনি।
বুয়ামার নেতারা বলেন, সংস্কার প্রতিবেদন বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে ব্যাপক বৈষম্যের স্বীকার হয়েছে হোমিও, ইউনানী ও আয়ুবের্দিক খাত। এই খাত নিয়ে সেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা ভুলে ভরা ও অসংগতিপূর্ণ। যেমন স্বাস্থ্য কমিশন প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে হোমিও, ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক সিস্টেমকে প্রথাগত, ট্রাডিশনাল ও টিসিএম এ্যালায়েড ও ট্রাডিশনাল হেলথ প্রফেশনাল বিভাগ. বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনানী ও আয়ুর্বেদিকে বিদ্যমান অর্ডিন্যান্স সংস্কার করে যুগোপযোগী করতে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন/অর্ডিন্যান্স এবং ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিল করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। পৃষ্ঠা নং -৫১, ৭৩, জনমত জরিপ থেকে প্রাপ্ত মতামত অনুযায়ী ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মানুষ সেবা দেয় উল্লেখ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অসত্য ও আপত্তিজনক। বর্তমানে টারশিয়ারি পর্যায়ে ১শ শয্যা (প্রস্তাবিত ২৫০) বিশিষ্ট একটি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে যেখানে বহি:বিভাগ প্রতিদিন গড়ে ২৫০ -৩০০ জন রোগী দেখা হয় এবং সারা দেশে প্রায় ২২৩টি জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইউনানী (বিইউএমএস) ও আয়ূর্বেদিক (বিএএমএস) চিকিৎসকগণ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। তারাও নিয়মিত মাসিক প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেরণ করেন। এই রিপোর্ট মোতাবেক ৮৪৪ জন স্নাতক ও ৩ হাজার ৭৩৩ জন ডিপ্লোমা চিকিৎসক রয়েছেন। যদিও এ সংখ্যা হচ্ছে স্নাতক হোমিও রেজিস্টার ১৮৬৫ জন, স্নাতক ইউনানী রেজিস্টার্ড ৫০১ জন এবং স্নাতক আয়ুর্বেদিক রেজিস্টার্ড ৪৫৯ জন সর্বমোট স্নাতক ২৮২৫ জন এবং ডিপ্লোমা চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক বেশি। শুধু মাত্র উল্লিখিত ৮৪৪ জন স্নাতক ও ৩ হাজার ৭৩৩ জন ডিপ্লোমা চিকিৎসক প্রতিদিন গড়ে ১ জন করে রোগী দেখলেও তা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৭৭ জন। এই সংখ্যা বছরে কত হতে পারে সহজেই অনুমেয়। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও জরিপ রয়েছে। উক্ত জরিপের তথ্যের সাথে রিপোর্টে উল্লিখিত তথ্য শুধু অসত্যই নয় বরং অবাস্তব এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে আমরা মনে করি।
বুয়ার সভাপতি ও মহাসচিব বলেন, হোমিওপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিৎসা কার্যক্রমের বিষয়ে নতুন করে প্রমাণভিত্তিক সিদ্বান্ত গ্রহণের কিছু নেই। এটি হাজার বছরের প্রমাণিত চিকিৎসা বিজ্ঞান, যা আরও আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজন গবেষণার। সুতরাং গবেষণার দ্বার উন্মোচনের জন্য বিএমআরসির (বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ) ন্যায় একটি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিএমডিসির (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কাউন্সিল, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে স্ব-স্ব চিকিৎসা পদ্ধতি স্ব-স্ব কাউন্সিল নিয়ন্ত্রণ করবে। এছাড়াও এমবিবিএস ও বিডিএস ব্যতীত কেউ চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখতে পারবে না এই বাক্যটি খুবই আপত্তিজনক।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কমিশনের প্রতিবেদনের ১৭০ ১৯(১) পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, বিএমডিসি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন (ব্যবস্থাপত্র) ছাড়া কোন ওষুধ বিতরণ করা যাবে না। এ বাক্যটি অসঙ্গতিপূর্ণ। কারণ, বিএমডিসি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের মাধ্যমে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ব্যবস্থাপত্র হয়। কিন্তু হোমিওপ্যাথিক কাউন্সিল, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক কাউন্সিল কর্তৃক রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনের ওষুধ কীভাবে বিতরণ করা হবে? বর্তমানে হোমিও, ইউনানী, আয়ূর্বেদিক মেডিকেল কলেজসমূহে এবং জেলা সদর হাসপাতাল ও থানা হেলথ কমপ্লেক্সসমূহে হোমিও, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎকদের দ্বারা প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে, তা বন্ধ হলে ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হবে।
স্বাস্থ্য সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনায় এসব অসংগতিসমূহ রেখে বৈষম্যহীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন বুয়ামার নেতারা। অতি দ্রুত তা সংশোধনের দাবি জানান তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

