নিজেই যেভাবে চাষ করবেন পুষ্টিগুণে ঠাসা 'সুপার ফুড' মাইক্রোগ্রিনস

নিজেই যেভাবে চাষ করবেন পুষ্টিগুণে ঠাসা 'সুপার ফুড' মাইক্রোগ্রিনস
ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশে বাণিজ্যিকভাবে মাইক্রোগ্রিনস উৎপাদন করা হয়। ছবি: বিবিসি বাংলা

পরিপক্ব সবজির তুলনায় মাইক্রোগ্রিনস বা ক্ষুদ্র চারাগাছে অনেক বেশি পুষ্টিগুণ থাকে বলে জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদরা।

কৃষিবিদদের মতে, বাড়ির যেকোনো জায়গায় এটি সহজে উৎপাদন করা যায় বলে বাংলাদেশে এর উপযোগিতাও বেশি।

বিজ্ঞাপন

কৃষি উৎপাদন বাড়াতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার খাবারের পুষ্টিগুণ কমিয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিপর্যায়ে পুষ্টির ঘাটতি মেটানোর কার্যকর হাতিয়ার হয়ে সামনে এসেছে মাইক্রোগ্রিনস। কোনো রকম রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ছাড়াই ঘরোয়াভাবে এটি উৎপাদন করা যায়। পরিপক্ব শাকসবজির চেয়ে এতে প্রায় চার গুণ পর্যন্ত বেশি পুষ্টি থাকে। ভিটামিন সি, ই, কে ও বিটাক্যারোটিন বেশি থাকায় একে 'সুপার ফুড' বলা হয়।

পুষ্টিবিদদের মতে, মাইক্রোগ্রিনস অতিরিক্ত ওজন, কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাস্ট্রিকসহ নানা রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি মানুষের শরীরে আয়রন ও পটাশিয়ামের চাহিদাও পূরণ করতে পারে। চুল পড়ার সমস্যা ও রক্তস্বল্পতা নিরসনেও এটি কার্যকর।

বাড়ির বারান্দা বা ছাদে যেকোনো পাত্রে বা ট্রেতে সহজেই এই অর্গানিক সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, যারা সীমিত জায়গায় চাষ করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি মূল্যবান ফসল। তবে এটি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপাদান কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় বাংলাদেশে এর প্রচলন এখনো খুব বেশি হয়নি।

মাইক্রোগ্রিনস কী?

সহজ কথায়, মাইক্রোগ্রিনস হলো সাত থেকে আট দিন বয়সের শাকসবজির চারা। বীজ থেকে প্রথমে স্প্রাউট বের হয়, আর তার পরের ধাপটিই হলো মাইক্রোগ্রিনস। লালশাক, মুলা, লেটুস, বাধাকপি বা ব্রকোলির বীজ মাটিতে ছিটিয়ে দিলে সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে যখন অঙ্কুরিত হয়, তখনই সেটিকে মাইক্রোগ্রিন বলা হয়। এই চারাগাছ এক বা দুই সপ্তাহ বয়সেই কাঁচা খেতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় আশির দশকে খাবারের সৌন্দর্য ও স্বাদ বাড়াতে প্রথম এর ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তীতে ইউরোপেও এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশে করোনা মহামারির পর থেকে এটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। ২০২২ সালে 'ওয়াটার অ্যান্ড প্লান্ট' নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে এটি নিয়ে কাজ শুরু করে।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা রিফাত খান তুষার জানান, মাইক্রোগ্রিনস উৎপাদন খুবই সহজ এবং কম সময়সাপেক্ষ। তবে যে পাত্রে এটি চাষ করা হবে, সেটি ফুড গ্রেড বা খাদ্য উৎপাদনে মানসম্পন্ন হলে ভালো হয়।

চাষ করার সহজ পদ্ধতি

কৃষি উদ্যোক্তা রিফাত খান তুষার জানান, দ্রুত বর্ধনশীল যেকোনো সবজিই মাইক্রোগ্রিনসের জন্য আদর্শ। তবে সব বীজ একইভাবে বা একই সময়ে অঙ্কুরিত হয় না। সূর্যমুখী বা মুলার বীজ এক রাত ভিজিয়ে রাখলে দ্রুত অঙ্কুরিত হয়। ছোট বীজগুলোকে সাবধানে ভেজানোর পর মাটিতে ছিটিয়ে দিতে হয়। নতুনদের জন্য সূর্যমুখী, মূলা, মটরশুঁটি এবং সরিষার বীজ দিয়ে শুরু করা সবচেয়ে ভালো, কারণ এগুলো দ্রুত অঙ্কুরিত হয়।

মাইক্রোগ্রিনস উৎপাদনে রাসায়নিক সারের কোনো প্রয়োজন নেই। ট্রে বা অন্য কোনো পাত্রে দুই ইঞ্চির মতো মাটির স্তরের সঙ্গে নারকেলের আঁশ কম্পোস্ট করে একটি বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। এরপর ভালো করে ভিজিয়ে ঘনভাবে বীজগুলো ছিটিয়ে দিতে হবে এবং মাটির আরেকটি হালকা স্তর দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ছিদ্রযুক্ত সমতল ট্রে ব্যবহার করা ভালো। পানি যাতে জমে না থাকে, সেজন্য সরাসরি পানি না দিয়ে ওয়াটার স্প্রে ব্যবহার করতে হবে।

ব্যয় সংক্রান্ত প্রশ্নে তুষার জানান, এটি বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করতে হয় বলে প্রাথমিক পর্যায়ে সামান্য কিছু বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, তবে সেটি অতিরিক্ত নয়। এটি সব আবহাওয়াতেই জন্মায়, তবে তীব্র গরমে কিছুটা বেশি পানি স্প্রে করতে হয়।

রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা ও সতর্কতা

মাইক্রোগ্রিনসে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল এবং গ্লুকোসিনোলেটের মতো যৌগ রয়েছে। প্যান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ডি জিওইয়া একে ছোট কিন্তু শক্তিশালী খাবার বলে উল্লেখ করেছেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, মাইক্রোগ্রিনস চাষের উদ্দেশ্য ভরপেট খাওয়া নয়, বরং শরীরের ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা।

পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিফ ডায়েটিশিয়ান নিশাত শারমিন নিশি জানান, এতে থাকা ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেলস মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লিভার ডিটক্সিফিকেশনের ক্ষেত্রেও এটি খুবই উপকারী।

তবে এই খাবারটি হাই-প্রোটিন যুক্ত হওয়ায় শিশুদের এটি না খাওয়ানোই উচিত। এ ছাড়া এতে পটাশিয়াম ও আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকায় যাদের হার্টের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই এমন রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই মাইক্রোগ্রিনস খাওয়া উচিত।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন