মহাবিশ্বের অন্ধকারে তখন একটি নক্ষত্র তার জীবনের শেষ অধ্যায়ে। পৃথিবী থেকে দূরত্ব প্রায় ৫০ কোটি আলোকবর্ষ। হঠাৎ সেখানে ঘটে গেল এক মহাবিস্ফোরণ। নক্ষত্র বিস্ফোরণের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ল মহাশূন্যে।
পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা অবশ্য সেই আলো আসার অপেক্ষায় ছিলেন না। চীনের একটি মহাকাশ টেলিস্কোপ প্রথমে অস্বাভাবিক এক ঝলক শনাক্ত করল। এরপর এক ঘণ্টার মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের টেলিস্কোপগুলো ঘুরে গেল সেই দূরবর্তী উৎসের দিকে। শুরু হলো মহাজাগতিক এক অনুসন্ধান।
চীনের আইনস্টাইন প্রোব মহাকাশ টেলিস্কোপ গত মার্চে প্রথম এক ঝলক এক্স-রে শনাক্ত করে। দ্রুতই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি একটি সুপারনোভা—মৃত্যুর পথে থাকা বিশাল একটি নক্ষত্রের ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
এরপর একে একে এতে যুক্ত হয় বিশ্বের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। তাদের মধ্যে ছিল চিলির সদ্য সক্রিয় হওয়া ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরিও।
রুবিন তখন আকাশ পর্যবেক্ষণের উচ্চাভিলাষী ১০ বছরের কর্মসূচি শুরু করেছে। আর সেই পর্যবেক্ষণের মধ্যেই ধরা পড়ে যায় একটি নক্ষত্রের মৃত্যু।
বিজ্ঞানীরা পরে অনুসরণ করেন বিস্ফোরণের আলো কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে। তাদের পর্যবেক্ষণের ফলাফল নিয়ে দুটি গবেষণাপত্র গত ১৪ জুলাই The Astrophysical Journal Letters-এ প্রকাশিত হয়েছে।
মৃত্যুর প্রথম কয়েক মুহূর্ত
সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের ভেতর থেকে একটি বিশাল অভিঘাত তরঙ্গ বা ‘শক ওয়েভ’ছুটে আসে। সেটি নক্ষত্রের বাইরের স্তর ভেদ করে মহাশূন্যে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বিস্ফোরণের প্রথম আলো দেখা যায়। এই ক্ষণস্থায়ী ঘটনাই ‘শক ব্রেকআউট’।
কিন্তু মহাবিশ্বে এমন দৃশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কখনো কয়েক সেকেন্ড, কখনো কয়েক ঘণ্টা। ফলে কোনো নক্ষত্রের মৃত্যুর একেবারে প্রথম আলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত বিরল।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, গত ২০ বছরে কোনো নক্ষত্রের বিস্ফোরণের শক ওয়েভ সরাসরি পর্যবেক্ষণের এটি মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা।
অর্থাৎ, এবার বিজ্ঞানীরা শুধু একটি নক্ষত্রের বিস্ফোরণ দেখেননি। তারা ধরতে পেরেছেন তার মৃত্যুর একেবারে প্রথম মুহূর্তটিও।
বিস্ফোরণটি ছিল অস্বাভাবিক
নতুন শনাক্ত হওয়া সুপারনোভাটিকে ‘টাইপ আইসি ব্রড-লাইনড’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
এ ধরনের বিস্ফোরণে প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি বেগে পদার্থের জেট বেরিয়ে যেতে পারে। সাধারণত এ ধরনের সুপারনোভার সঙ্গে গামা-রে বিস্ফোরণের সম্পর্কও দেখা যায়।
কিন্তু এই নক্ষত্রটি বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন ধাঁধা তৈরি করেছে।
এর ‘শক ব্রেকআউট’ ছিল কোনো ‘টাইপ আইসি ব্রড-লাইনড’ সুপারনোভায় এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে ম্লান। আরো বিস্ময়ের বিষয়, বিস্ফোরণের সঙ্গে কোনো গামা-রে বিস্ফোরণ দেখা যায়নি।
কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ এবং গবেষণার সহলেখক ব্রেন্ডান ও’কনর বলেন, পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করেও গামা-রে বিস্ফোরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একটি সম্ভাবনা হলো, নক্ষত্রের পৃষ্ঠ অথবা নক্ষত্রটিকে ঘিরে থাকা পদার্থের কারণে জেটটি ‘আটকে’ গিয়েছিল।
অর্থাৎ, বিস্ফোরণের ভেতরে শক্তিশালী জেট তৈরি হলেও সেটি হয়তো নক্ষত্রের বাইরের স্তর পেরিয়ে বের হতে পারেনি।
মহাবিশ্বের এক প্রান্তে, পৃথিবীর বহু চোখ
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকগুলোর একটি হলো—একটি টেলিস্কোপের দেখা সংকেতের পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের টেলিস্কোপগুলো প্রায় একই ঘটনার দিকে নজর দেয়।
চিলির রুবিন অবজারভেটরি এই বিস্ফোরণ দেখতে পেয়েছিল অনেকটা কাকতালীয়ভাবে। বিস্ফোরণের সময় সেটি আকাশের ওই নির্দিষ্ট অংশের দিকে তাকিয়ে ছিল। অঞ্চলটি ‘কসমস ডিপ ড্রিলিং ফিল্ড’নামে পরিচিত।
রুবিনের দ্রুত পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং অভূতপূর্ব সংবেদনশীলতার কারণে সুপারনোভাটির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন অনুসরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
পরবর্তী কয়েক বছর বিস্ফোরণটি কীভাবে বিবর্তিত হয়, তার বিস্তারিত রেকর্ড তৈরি করতে পারবে রুবিন।
এই পর্যবেক্ষণকেন্দ্র আগামী এক দশকে দক্ষিণ আকাশ বারবার পর্যবেক্ষণ করবে। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের পরিবর্তনের একটি বিশাল ‘টাইম-ল্যাপস’তৈরি হবে। এতে লাখো সুপারনোভা, গ্রহাণু, ধূমকেতু এবং অন্যান্য ক্ষণস্থায়ী মহাজাগতিক ঘটনা শনাক্ত হওয়ার আশা রয়েছে।
এক টেলিস্কোপ দেখল, অন্যগুলো ছুটল
রুবিনের মতো টেলিস্কোপ আকাশে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা শনাক্ত করার পর সেটির বিস্তারিত অনুসন্ধানে অন্য পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোও দ্রুত যুক্ত হতে পারে।
এই ঘটনায় অ্যারিজোনার কিট পিক ন্যাশনাল অবজারভেটরিতে অবস্থিত ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের নিকোলাস ইউ. মায়াল ৪ মিটার টেলিস্কোপে থাকা ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট অনুসরণমূলক পর্যবেক্ষণ চালায়।
এই যন্ত্র বিস্ফোরণটিকে ‘টাইপ আইসি ব্রড-লাইনড’ সুপারনোভা হিসেবে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
এরপর বিজ্ঞানীরা চিলির ভিক্টর এম. ব্ল্যাঙ্কো ৪ মিটার টেলিস্কোপে থাকা ৫৭ কোটি পিক্সেলের ডার্ক এনার্জি ক্যামেরার ১০ বছরের পুরোনো তথ্য পরীক্ষা করেন।
সেখানে বিস্ফোরণের ঠিক জায়গায় একটি ‘নীল উৎস’পাওয়া যায়।
এই পুরোনো তথ্য বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দেয়। বিস্ফোরণের আগে নক্ষত্রটি এবং তার চারপাশের পরিবেশ কেমন ছিল, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
হাওয়াইয়ের জেমিনি নর্থ এবং চিলির জেমিনি সাউথ টেলিস্কোপও এই বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিলিয়ান রাস্টিনিয়াডের নেতৃত্বাধীন দল এসব টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করে বিস্ফোরণটি পরীক্ষা করে।
তাদের পর্যবেক্ষণও বিস্ফোরণটিকে ‘টাইপ আইসি ব্রড-লাইনড’ সুপারনোভা হিসেবে নিশ্চিত করে। পাশাপাশি বিস্ফোরণের আগে নক্ষত্রটির গঠন ও আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে পুরোনো তথ্য পাওয়া যায়।
নক্ষত্রটির মৃত্যু ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল
মৃত নক্ষত্রটির ভর ছিল সূর্যের প্রায় ২০ গুণ। এটি ছিল ‘উলফ-রেয়েট’শ্রেণির নক্ষত্র। জীবনের শুরুর দিকেই এটি তার অধিকাংশ হাইড্রোজেন ব্যবহার করে ফেলেছিল।
কিন্তু মৃত্যুর আগে নক্ষত্রটি একবারে সবকিছু হারায়নি। পর্যায়ক্রমে এটি বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম মহাশূন্যে ছুড়ে দিয়েছিল।
শেষ দিকে নক্ষত্রটির অবশিষ্ট অংশে ছিল মূলত কার্বন ও অক্সিজেন।
নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে যাওয়া সেই পদার্থগুলো তার চারপাশে একের পর এক স্তর বা খোলস তৈরি করেছিল। পরে নক্ষত্রটি বিস্ফোরিত হলে সেই পুরোনো পদার্থের সঙ্গে সুপারনোভার নতুন পদার্থের মিথস্ক্রিয়া শুরু হয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এবার সেই প্রক্রিয়াটিও অনুসরণ করার সুযোগ পেয়েছেন।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিলিয়ান রাস্টিনিয়াড বলেন, তাদের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিস্ফোরণের তিনটি অংশের পদার্থবিদ্যা বোঝা সম্ভব হয়েছে। এগুলো হলো এক্স-রে শক ব্রেকআউট, এর সঙ্গে ঘটে যাওয়া সুপারনোভা এবং মৃত্যুর আগে নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে আসা পদার্থের সঙ্গে সুপারনোভার মিথস্ক্রিয়া।
এই তথ্যের মাধ্যমে নক্ষত্রটিকে ঘিরে থাকা পদার্থের গঠন এবং বিস্ফোরণের আগে তার ‘সহিংস জীবনযাপন’সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে।
প্রথমবার দেখা গেল মৃত্যুর আগের পরিবেশ
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের জ্যোতির্বিজ্ঞানী গোকুল শ্রীনিবাসরাঘবন বলেন, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম হারানো একটি নক্ষত্রের বিস্ফোরণের আগে তার চারপাশের পরিবেশ এভাবে মানচিত্রে তুলে ধরার ঘটনা এবারই প্রথম।
এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীরা এখন জানতে চান, একই ধরনের অন্য নক্ষত্রগুলোর মৃত্যুর আগে কি একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সব হাইড্রোজেন-হিলিয়াম হারানো নক্ষত্র কি বিস্ফোরণের আগে একইভাবে পদার্থ ছুড়ে ফেলে? তাদের ‘শেষ জীবন’কি একই রকম?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরো শক ব্রেকআউট পর্যবেক্ষণের অপেক্ষায় আছেন তারা।
সূত্র: লাইভ সাইন্স
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


