সবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছি। পথঘাট ভালোমতো চিনি না। কোন ট্রেন কত দূরে যায় বা কোন রুটে চলে সে সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না। মুঠোফোনে একটার পর একটা অ্যাপ নামাতে নামাতে স্টোরেজ ফুল হওয়ার অবস্থা। তারপরও অ্যাপ আর ম্যাপ ছাড়া অস্ট্রেলিয়াতে চলা অসম্ভব।
দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনলে অনেক দাম পড়ে বিধায় ফেসবুকের মার্কেটপ্লেসে সারাদিন খোঁজাখুঁজি করতাম কম দামে দরকারি জিনিস পাওয়া যায় কি না। এ এক অদ্ভুত বাজার! কারো কাছে যে জিনিস অদরকারী, আরেকজনের কাছে সেটাই মহামূল্যবান। কেউ বাসা বদলাচ্ছে, কেউ পুরোনো আসবাব সরাচ্ছে, কেউ নতুন কিছু কিনে আগেরটা দিয়ে দিচ্ছে। আর আমার মতো নতুন আসা মানুষ সেসব পোস্টে চোখ বুলিয়ে প্রয়োজন আর সামর্থ্যের মধ্যে সমঝোতা করার চেষ্টা করছে।
মাঝেমধ্যে এমন সব লোভনীয় জিনিস পেয়ে যেতাম, মনে হতো পৃথিবীতে মানুষের চাহিদার চেয়ে অদরকারী জিনিসের সংখ্যাই মনে হয় বেশি। কিন্তু সমস্যা হতো ঘরে আনা নিয়ে। অনেক দূরের কোনো এলাকায় চমৎকার একটা জিনিস ফ্রিতে পাওয়া গেলেও যাতায়াতের হিসাব কষে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলতাম। এর ওপর আমার গাড়ি ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে গাড়ি না থাকা মানে অনেকটা পা থেকেও পঙ্গু হয়ে থাকা। সব জায়গায় বাস চলে না, ট্রেনও সবখানে পৌঁছায় না। কখনো ট্রেন থেকে নেমে বাস ধরতে হয়, তারপর হাঁটতে হয় আরো কয়েক কিলোমিটার। ফলে কোথাও যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপের সঙ্গে দীর্ঘ বোঝাপড়া করতে হতো।
যে বাসায় থাকতাম, এখানে কোনো দেয়ালঘড়ি ছিল না। একটা দেয়ালঘড়ির দরকার খুব বেশি অনুভূত হচ্ছিল। দেয়ালঘড়ি ছাড়া আমার আবার চলে না। দেশে থাকতে দেয়ালঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে। সময় দেখার প্রয়োজন হলে বারবার দেয়ালের দিকে চোখ চলে যায়।
কাজেই মার্কেটপ্লেসে পুরোদমে দেয়ালঘড়ি খুঁজতে লাগলাম। অল্প সময়ের মধ্যে পেয়েও গেলাম। প্রায় নতুন কাঠের আকর্ষণীয় ডিজাইনের একটা দারুণ দেয়ালঘড়ি! তার থেকেও লোভনীয় ব্যাপার এটি পেতে পয়সা খরচ করতে হবে না।
একটা মেয়ে দেয়ালঘড়িটা ফ্রিতে দিয়ে দেবে। শর্ত একটাই—ঘড়িটা তার কাছ থেকে নিয়ে আসতে হবে।
যথারীতি গুগলের দ্বারস্থ হলাম। মেয়েটার ঠিকানা অনুসন্ধান করে দেখলাম আমি যেখানে থাকি, সেখান থেকে অনেক দূর।
গুগল ম্যাপে যাতায়াতের বিভিন্ন উপায় খুঁজতে লাগলাম। ট্রেনে যেতেই আড়াই ঘণ্টার ওপরে লাগবে। সেখান থেকে দুই কিলোমিটার মতো হাঁটা পথ। ঘড়িটার লোভেই কি না আমি মেয়েটাকে নক করলাম। আমার আগ্রহ দেখেই সম্ভবত মেয়েটা জানাল, আমি যদি তার নিকটস্থ ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারি, তাহলে সে তার গাড়ি নিয়ে স্টেশনে আসবে। প্রস্তাবটা খারাপ না। আড়াই ঘণ্টা লাগলেও ট্রেনে বসে থাকতে মন্দ লাগে না। জানালা দিয়ে চারপাশ দেখা যায়। তাছাড়া মুঠোফোন, এয়ারবাড—এসবে সময় কীভাবে খেয়ে নেয়, বোঝা যায় না। কাজেই রাজি হয়ে গেলাম। নির্দিষ্ট দিন দুপুরের পরপরই রওনা দিলাম।
ট্রেনে করে যখন তার নিকটস্থ স্টেশনে পৌঁছালাম, তখন বিকালের রঙ এক আশ্চর্য রূপ ধরেছে। অপরূপ সুন্দর হয়ে উঠেছে ধরণী। আশপাশে দালানকোঠা, দোকানপাট তেমন নেই। একটু দূরেই চাষের জমি। তার ওপারে শুধু মাঠ আর মাঠ। যতদূর চোখ যায় ধু-ধু প্রান্তর। এটাকে অস্ট্রেলিয়ার ‘গ্রাম’ বলা যায়। তবে মানুষজন একেবারেই সীমিত। বোঝাই যায় অস্ট্রেলিয়ার মানুষ গ্রামে থাকতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। অনেকের মুখে শুনেছি গ্রামের দিকে থাকলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (পিআর) পেতে সুবিধা হয়। এ কারণে কিছু মানুষ গ্রামে থাকে। বাকিরা হয়তো চাকরি-বাকরির প্রয়োজনে। অস্ট্রেলিয়া এমনিতেই নির্জন দেশ। তার ওপর তাদের গ্রাম কেমন হবে, সেটি সহজেই অনুমেয়।
আমি পৌঁছেই দেখি একটা মেয়ে মুখ নিচু করে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে আছে। মেয়েটাকে দেখেই আমার বেশ আশ্চর্য লাগল। কারণ এ বয়সে মেয়েরা অপেক্ষমাণ সময়ে ফোন চালাবে না এটি হতেই পারে না। আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে ‘হাই’ বলে আমার পরিচয় দিলাম। মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল। আমি তার চোখ দেখেই শিউরে উঠলাম। টকটকে লাল, বিষণ্ণ। যেন কত রাত ঘুমায়নি! মেয়েটি সম্ভবত চায়নিজ। তবে কথা শুরু হতেই বুঝলাম ইংরেজিতেও বেশ দক্ষ।
অনেক কথা হলো। সব কথা বলল নিচু কণ্ঠে। আমার বুঝতেই বেশ সমস্যা হচ্ছিল। সে জানাল একটা সময় পৃথিবীটাকে তার খুব আপন মনে হতো। এখন আর তা হয় না। সে জীবনটাকে একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করছে। তার মূল্যবান বা পছন্দের যে জিনিসগুলো ছিল, সেগুলো আস্তে আস্তে মানুষকে দিয়ে দিচ্ছে। করোনার সময় তার বেশিরভাগ জিনিসই সে অন্যদের দিয়ে দিয়েছে। মানুষের তৃপ্ত চোখ তাকে খুব আনন্দ দেয়। অল্প কিছু পছন্দের জিনিস এখনো অবশিষ্ট আছে। সেগুলোও দিয়ে দেবে। নিজের কাছে কিছুই রাখবে না। মেয়েটি শুধু ঘড়ি নয় আরো কিছু জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। সেগুলো আমাকে দিল। কথা বলতে বলতে ট্রেনের সময় হয়ে এলো। এটাই সেখানকার শেষ ট্রেন। এটি মিস করলে শহরে ফেরা যাবে না।
মেয়েটি আমাকে বলল দ্রুত উঠতে। আমিও উঠলাম। মেয়েটি আমার একটি হাত চেপে ধরল। বরফের চেয়েও শীতল। তার চোখে অশ্রু। শেষ কথা যা বলল—সে অনেক দিন হলো একা থাকে। তার আপন কেউ নেই। কারো সঙ্গে বন্ধুত্বও হয় না। এভাবে চলতে থাকলে সে হয়তো আর বেশিদিন বাঁচবে না।
ট্রেন আসার ঘোষণা প্রচার হলে আমি হাত ছাড়িয়ে ট্রেনে উঠে বসলাম। বাইরে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। সঙ্গে শীতল হাওয়া বইছে। ট্রেনের ভেতর থেকে মেয়েটি আবছা দেখা যাচ্ছে। তাতে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না সে কাঁদছে। আমি চিন্তার স্রোতকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করলাম।
কয়েক দিন পর মেয়েটিকে মেসেঞ্জারে ধন্যবাদ দেব বলে মনস্থির করলাম। আশ্চর্য! তার মেসেঞ্জার বন্ধ! মেয়েটার প্রোফাইলে ঢোকার চেষ্টা করলাম। সেখানেও তার অস্তিত্ব পেলাম না। মেয়েটার ফোন নম্বর জানি না। আলাপ যা হয়েছিল সব মেসেঞ্জারে। হঠাৎ বুকের মধ্যে হু হু করে উঠল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

