আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের কালচার বইয়ের ‘বিভাগ-পূর্ব বাংলা সাহিত্য’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বিভাগ-পূর্ব বাংলার সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র দত্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি করিয়াছিলেন বলিয়াই পরবর্তীকালে কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু প্রমুখ গণসাহিত্য সৃষ্টির স্তরে পৌঁছিয়াছেন।’
একই বইয়ের ‘আমাদের জাতীয় সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি আরো বলেন, ‘...এই জাতীয় যুগ আমাদের সাহিত্যে আসিতেই হইবে। জাতীয় জীবন রূপায়ণের মধ্য দিয়া গণজীবন রূপায়ণের এই অমোঘ ঐতিহাসিক প্রসেস আমাদের মানিয়া লইতেই হইবে।’
আবুল মনসুর আহমদের এই বক্তব্যের আলোকে জাতীয় সাহিত্য ও গণসাহিত্যের পারস্পরিক সম্পর্ক, বৈশিষ্ট্য এবং তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
খ্যাতনামা সাহিত্য-সমালোচক ও চিন্তাবিদ আহমদ শরীফের মতে, জীবন এক অনন্য, অনুপম ও দুর্লভ ঐশ্বর্য। এই জীবনের স্বাদ যে একবার সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করে, সে আনন্দলোকের সন্ধান পায়। জীবন-ধনে যে সমৃদ্ধ, তার কাছে সমগ্র পৃথিবী হয়ে ওঠে রূপময় ও অপরূপ। সেই সৌন্দর্যের অনুরাগে মানুষের স্বভাবে আসে কোমলতা, হৃদয়ে জাগে ঔদার্য আর চিত্তে গড়ে ওঠে মাধুর্যের ভুবন। তখন সে মানুষের প্রতি প্রীতি ও শুভেচ্ছা ছড়িয়ে দেয় এবং বিনিময়ে অর্জন করে মানুষের ভালোবাসা। মানবজমিনে এমন আবাদ কখনো নিষ্ফল হয় না।
মন-প্রাণের এই মানবিক অনুশীলনই সংস্কৃতিচর্চা; আর এ অনুশীলনের পরিণত রূপই সংস্কৃতি। সংস্কৃতিমান মানুষ প্রীতিপরায়ণ, সংবেদনশীল, পরিণামদর্শী ও কল্যাণপ্রবণ হয়ে ওঠে। সাহিত্যও সেই সংস্কৃতিচর্চারই অন্যতম প্রধান বাহন।
প্রথমেই প্রশ্ন আসে—জাতীয় সাহিত্য বলতে আমরা কী বুঝি?
বাংলাদেশের জাতীয় সাহিত্য বলতে সেই সাহিত্যকে বোঝায়, যা জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস, সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং মানবিক স্বপ্নকে ধারণ ও প্রতিনিধিত্ব করে। এ সাহিত্য কেবল শিল্পসৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত চেতনারও শিল্পরূপ। বাংলা ভাষা, লোকঐতিহ্য, সংগীত, নদী, প্রকৃতি, কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং তৃণমূলের মানুষের জীবন—এসবের দৃঢ় ভিত্তির ওপর যে সাহিত্য নির্মিত হয়, তাকেই জাতীয় সাহিত্য বলা যায়।
বাংলাদেশের জাতীয় সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদ, ব্রিটিশবিরোধী ও পাকিস্তান আন্দোলন, সাতচল্লিশ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই বিপ্লব। এসব সংগ্রামকে কেন্দ্র করে অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা, চলচ্চিত্র ও গান রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এসব সৃষ্টিকর্ম আমাদের জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরো সুদৃঢ় করেছে।
জাতীয় সাহিত্যে কখনো কেবল অভিজাত বা এলিট-চেতনা প্রাধান্য পায় না; বরং সাধারণ মানুষের জীবন, সংগ্রাম, দুঃখ-বেদনা, প্রেম, লোকবিশ্বাস, প্রতিবাদ এবং স্বপ্নই এর প্রাণশক্তি। ন্যায়, সাম্য, মুক্তচিন্তা, মানবিক সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাতীয় সাহিত্যকে কেবল দেশীয় পরিসরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
বাংলাদেশের জাতীয় সাহিত্য নির্মাণে কবিদের অবদান সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। ইসমাঈল হোসেন সিরাজীর পরে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ, সাম্য, মানবমুক্তি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কণ্ঠস্বর হয়ে জাতীয় সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। শামসুর রাহমান পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষাকে আধুনিক কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। আল মাহমুদ বাংলাদেশের ইতিহাস, আবহমান বাংলা, বাংলাদেশি ভাষা, বাংলাদেশি ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের জাতীয় চেতনাকে স্বতন্ত্র কাব্যভাষায় শিল্পরূপ দিয়েছেন।
কথাসাহিত্যেও জাতীয় সাহিত্য সমানভাবে সমৃদ্ধ। মীর মশাররফ হোসেন, নাজিবুর রহমান সাহিত্যরত্ন, মাহবুব-উল-আলম, কাজী ইমদাদুল হক, শওকত ওসমান, শাহেদ আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও জহির রায়হান সমাজবাস্তবতা, রাষ্ট্রচেতনা এবং মানুষের অস্তিত্বসংকটকে তাদের রচনায় গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আহমদ ছফা, আল মহামুদ, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, শফিউদ্দিন সরদার প্রমুখ লেখক বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের বহুমাত্রিক জীবনকে সাহিত্যে ধারণ করেছেন।
অন্যদিকে আবু ইসহাক, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, মতিউর রহমান প্রমুখ কথাসাহিত্যিক তৃণমূলের মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও বাস্তবতাকে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করে জাতীয় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এভাবে কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, নাটক, স্মৃতিকথা ও অন্যান্য সাহিত্যধারার সম্মিলিত বিকাশের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জাতীয় সাহিত্য আজ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা অর্জন করেছে।
গণসাহিত্য
অন্যদিকে গণসাহিত্য বলতে সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম, বঞ্চনা, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে রচিত সেই সাহিত্যকে বোঝায়, যা বৃহত্তর জনসমাজের ভাষা, অভিজ্ঞতা ও স্বার্থকে ধারণ করে। এটি কেবল বিষয়বস্তুর দিক থেকেই নয়, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকেও স্বতন্ত্র। গ্রাম, মফস্বল, শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, মজুর এবং সমাজের উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবনই গণসাহিত্যের প্রধান উপজীব্য।
গণসাহিত্যে অন্যায়, বৈষম্য, শোষণ, সামন্তবাদ, কুসংস্কার, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারিত হয়। এ সাহিত্য অযথা অলংকারনির্ভর নয়; বরং সহজ, প্রাণবন্ত ও জীবনঘনিষ্ঠ ভাষার মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছায়। ফলে পাঠক সেখানে নিজের জীবন, সমাজ ও সময়ের প্রতিফলন দেখতে পান। গণসাহিত্য কেবল মানুষের দুঃখ-কষ্টের বিবরণ নয়; এটি মানুষকে সচেতন করে, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করে।
আহমদ শরীফের ভাষায়, আধুনিক যুগে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে মানুষেরই কর্ম, বিবেক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। মানুষের লোভ, স্বার্থপরতা এবং অমানবিক আচরণই অধিকাংশ দুর্ভোগের মূল কারণ। তাই মানুষকে শোষণ, পীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়। সাহিত্যিকও তার সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে মানুষকে অধিকতর বিবেকবান, সংবেদনশীল ও পরিণামদর্শী হওয়ার আহ্বান জানান। যৌথ জীবনের সুখ-দুঃখ ও লাভ-ক্ষতি ভাগ করে নেওয়ার যে মানবিক চেতনা, গণসাহিত্যের অন্যতম ভিত্তি সেখানেই নিহিত।
বাংলা গণসাহিত্যের শিকড় নিহিত রয়েছে গ্রামীণ সাহিত্যধারায়। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, রসুল কাব্য, পীর সাহিত্য, সুফি সাহিত্য, বৈষ্ণব পদাবলি, পুঁথি সাহিত্য, পালাগান, জারি-সারি-মুর্শিদি-মারেফতি গান, পল্লিগাথা ও পল্লিসংগীতের মতো ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যধারায় সাধারণ মানুষের জীবন, বিশ্বাস, শ্রম ও সংস্কৃতির যে প্রকাশ ঘটেছে, তা পরবর্তী সময়ে গণমুখী সাহিত্যচর্চার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে আধুনিক অর্থে গণসাহিত্য একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা, যার বিকাশ বিশেষভাবে উনিশ ও বিশ শতকের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে।
গণসাহিত্য কোনো বিশেষ শ্রেণির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টির সাহিত্য নয়; বরং এটি মানবমুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও সহমর্মিতার সাহিত্য। এর মূল শক্তি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজকে আরো মানবিক করে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে।
বলা যায়, জাতীয় সাহিত্য ও গণসাহিত্য পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অন্যের পরিপূরক। জাতীয় সাহিত্য একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্মিলিত চেতনাকে ধারণ করে; অন্যদিকে গণসাহিত্য সেই জাতির মাটি, মানুষ, শ্রম, বেদনা, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে শিল্পরূপ দেয়। একটির ভিত্তি অন্যটিকে দৃঢ় করে, একটির পরিপূর্ণতা অন্যটির মধ্যে নিহিত।
আবুল মনসুর আহমদ যথার্থই বলেছেন, জাতীয় জীবন রূপায়ণের মধ্য দিয়েই গণজীবনের রূপায়ণ সম্ভব। অর্থাৎ জাতীয় সাহিত্য যখন একটি জাতির সামগ্রিক আত্মপরিচয় নির্মাণ করে, তখন গণসাহিত্য সেই পরিচয়কে সাধারণ মানুষের জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে পূর্ণতা দেয়। ফলে বাংলাদেশের সাহিত্যধারায় এ দুটি প্রবণতা কখনো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একই সাংস্কৃতিক প্রবাহের দুটি পরস্পর-সম্পূরক ধারা।
বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার এই সময়ে জাতীয় সাহিত্য ও গণসাহিত্য—উভয়েরই প্রয়োজন আরো গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। কারণ একটি জাতির সাহিত্য তখনই সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, যখন সেখানে যেমন জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি স্থান পায়, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন, বঞ্চনা ও সম্ভাবনাও সমান গুরুত্ব লাভ করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

