বাঙালি বীরত্বের প্রবল প্রতাপের প্রতিচ্ছবি গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্র। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে বাংলাদেশ জুড়ে এর ছিল গৌরবময় উপস্থিতি। ইনকিলাবি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে তারা রাজত্ব করত, যাদের ভয়ে গ্রিক সিপাহসালার আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সৈন্যসামন্ত নিয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রটির নাম ছিল গঙ্গাঋদ্ধি। গঙ্গাঋদ্ধিদের সুনাম-সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সমসাময়িক গ্রিক ও লাতিন পর্যটক, ভূগোলবিদ ও পণ্ডিতদের কলমে এ জাতির শৌর্যবীর্য ও জ্ঞান-গরিমার সপ্রশংস চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
পণ্ডিত ড. এম.এ আজিজ ও ড. আহমদ আনিসুর রহমান আমাদের জানান, ‘খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডারের উপমহাদেশ অভিযানের সময়েও বাংলার অধিবাসীরা শৌর্যবীর্য, সভ্যতা ও কৃষ্টিতে শীর্ষস্থানে ছিল। বহুজাতির আবাসভূমি এ উপমহাদেশে গঙ্গাবিধৌত গঙ্গাঋদ্ধি জাতিই ছিল শ্রেষ্ঠ। কার্তিয়াস, ডিওডোরাস, প্লুতার্ক প্রমুখ গ্রিক লেখকের ইতিবৃত্ত, স্ট্রাবো ও টলেমির ভৌগোলিক বৃত্তান্ত আর ভার্জিলের মহাকাব্য থেকে এ সময়কার বাংলার অধিবাসীদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রিক ও লাতিন লেখকদের গ্রন্থে বঙ্গরাষ্ট্রের নাম পাওয়া যায় না। তবে গঙ্গাঋদ্ধিরা যে বঙ্গ জনপদের অধিবাসী দ্রাবিড় এবং এ ভৌগোলিক সীমায়ই যে গড়ে উঠেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম শক্তিশালী গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্র, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। .. দ্রাবিড়রা ছিলেন ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের নরগোষ্ঠীর লোক এবং তাদেরই একটি দল গঙ্গা মোহনায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করে এক উন্নততর সভ্যতা গড়ে তোলেন। পণ্ডিতদের মতে, ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ নামটি সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত নয়। এতে মনে হয়, এ রাজ্যের অবস্থান ছিল আর্য জগতের বাইরে। গঙ্গাঋদ্ধিই সম্ভবত বাংলার প্রাচীনতম স্বাধীন রাষ্ট্র।’ তাই বলা যায়, বঙ্গ দ্রাবিড়ি বা বাঙ দ্রাবিড়ি জাতিই ছিল গঙ্গাঋদ্ধির জনবল।
প্রথম শতকের পাশ্চাত্য দার্শনিক প্লিনি জানান, বঙ্গরাজ মগধসহ গোটা আর্যাবর্ত জয় করে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে বসেছেন। গঙ্গার দক্ষিণ অংশের অধিবাসীদের গাত্রবর্ণ ছিল কালো এবং রৌদ্রে পোড়া, কিন্তু তারা ইথিওপিয়ানদের মতো কালো ছিল না। মেগাস্থিনিস তার ‘Ta Indika’ কিতাবে লিখেছেন, ‘যে জাতি ভারতের শেষ প্রান্তে বাস করে, তাহার নাম গাঙ্গেয় (Gangarides); তাদের রাজার এক হাজার অশ্বারোহী, ৭০০ হাতি ও ৬০ হাজার পদাতিক যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তুত আছে।’ মহাবীর আলেকজান্ডার এসব বিবরণী শুনে এই অঞ্চল জয়ের রাশা ত্যাগ করেছিলেন। পাশ্চাত্যের দূরবর্তী দেশগুলো পরবর্তী ৫০০ বছর গঙ্গাঋদ্ধি জাতির নাম ও যশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল।
জগদ্বিখ্যাত এই জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কে বহির্জগতের মনীষীরা সরব। বিদেশী ঐতিহাসিকরা বাঙালি জাতির ঐশ্বর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি বলে উল্লেখ করেছেন। মহাকবি ভার্জিল তাদের শৌর্যবীর্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। অর্ধসহস্র বছর বীরবিক্রমে তারা বাংলায় সুশাসন জারি রেখেছিল। তাদের সমকক্ষ জাতি তখন পৃথিবীতে খুব বেশি ছিল না। দুঃখের বিষয় হলো হিন্দু পুরাণ বা সমকালীন কোনো গ্রন্থে সে জাতির কোনো বিবরণ নেই।
২
গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্রের রাজধানী ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের অবস্থান নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, বিশেষজ্ঞ ও আলেম-ওলামারা একমত হতে পারেননি। যশোরের বারোবাজার, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া, পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড়, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, বিক্রমপুরের সোনারং, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর, খিজিরপুর বা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এবং ঢাকা গঙ্গাঋদ্ধির রাজধানী হতে পারে। তবে গঙ্গাঋদ্ধির সঙ্গে মসলিনশিল্পের সম্পৃক্ততা অতি পুরোনো। আর ঢাকা ও সোনারগাঁওই মসলিনশিল্পের জন্য সুবিখ্যাত। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের বয়ান ‘বাংলার মসলিন বাগদাদ রোম চীন/কাঞ্চন তৌলেই কিনতেন একদিন’ আজও প্রবাদ। মসলিন হলো অতি কোমল ও সূক্ষ্ম কার্পাস পোশাক। প্রাচীন ব্যাবিলনের মসৌলে নির্মিত সূক্ষ্ম মসৃণ বস্ত্রসদৃশ ঢাকায় তৈরি বস্ত্রের নাম হয় মসলিন। আদিকাল থেকেই বাংলার বয়নশিল্প পৃথিবীব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেছিল। Birdwood রচিত ‘Industrial Arts of India’ গ্রন্থে মসলিনকে সোলেমানের পর্দার মতো লাবণ্যময় ও মনুসংহিতার চাইতে প্রাচীনতর বলে অভিহিত করা হয়েছে। বহু শতাব্দীকাল ধরে বাংলাদেশের মসলিন খ্যাতি ও জৌলুস অক্ষুণ্ণ ছিল। এর মধ্যে নিঃসন্দেহে ঢাকাই মসলিনের অবস্থান ছিল শীর্ষদেশে। পণ্ডিত প্লিনি ‘গঙ্গেয় মসলিন’ নামে পরিচিত ঢাকার মসলিনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। গঙ্গে বন্দর থেকে সুদূর পশ্চিমে ঢাকার মসলিন রপ্তানি হতো। মলমল নামক ঢাকাই মসলিন আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে।
৩
বিশিষ্টজনদের মতে, গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্রের উদ্ভব, বিকাশ ও সমৃদ্ধি বাঙালির ইতিহাসের স্পষ্ট উষাকাল। পদ্মার সঙ্গে গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্র একাকার। পদ্মাকে পদ্মাবতীও বলা হয়েছে কোনো কোনো বর্ণনায়। ঢাকার বুড়িগঙ্গাই প্রাচীন পদ্মা-গঙ্গার খাত। পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় কৃত্তিবাস পদ্মাবতীকেই বলেছেন বড়গঙ্গা। অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ ভূগোলবিদ ও মানচিত্রকার রেনেল পদ্মাকেই গঙ্গা বলেছেন। তিনিই প্রথম বাংলাদেশের নদী ও ভূপ্রকৃতির মানচিত্র বৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি করেন। তার মানচিত্রে পদ্মাকেই গঙ্গার মূলধারা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চৈতন্যদেব তরুণ বয়সে পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন। ত্রিপুরারাজ বিজয়মাণিক্য ১৫৫৯ সালে ত্রিপুরা থেকে ঢাকায় এসে ইছামতী বেয়ে যাত্রাপুরে এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন।
সার্বিক পর্যালোচনায় আমরা মনে করি, ঢাকাই গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল। একালের পদ্মা নদী গঙ্গার পুরাকালের গতিপ্রবাহ নয়। বর্তমান বুড়িগঙ্গাই আদি গঙ্গার মূলধারা। সেই আদি গঙ্গার তীরেই গড়ে উঠেছিল গঙ্গাঋদ্ধি রাজধানী। ১৬১০-১৭১৭ সময়কালে ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানীর মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিল। বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ছিল ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার অভিষেক হওয়া ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি। সম্প্রতি আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ দাবিকে আরো সংহত করে। চমকে যাওয়ার মতোই এ তথ্য। সম্প্রতি আবিষ্কৃত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, ঢাকার বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও খননকাজের তত্ত্বাবধায়ক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় প্রায় সব উৎখনন খাদে প্রাচীন মানববসতির আলামত পাওয়া গেছে, যা পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়, ঢাকার ইতিহাস শুধু কয়েকশ বছরের নয়, প্রায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার বছরের। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দূরত্ব অনুযায়ী প্রত্নস্থানগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আদর্শ ভূমিরূপে প্রাচীনকাল থেকেই ঢাকায় গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ মানববসতি ও সভ্যতা।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা বলছেন, প্রাচীন দুর্গের সন্ধানে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে পরিচালিত এক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আদি-ঐতিহাসিক যুগের গ্লেজড ও রোলেটেড মৃৎপাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা ঢাকাকে ভূমধ্যসাগর ও পারস্য বা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা যোগাযোগের সম্পর্ককে নির্দেশ করে। এ বাণিজ্যপথ বা সিল্ক রুটের সঙ্গে যুক্ত ছিল আদি-ঐতিহাসিক যুগের উয়ারী-বটেশ্বর ও পুণ্ড্রবর্ধন বা মহাস্থানগড়ও।
তথ্যসূত্র
১. মুহম্মদ হাবিবুর রহমান : গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমি ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৩
২. বাংলাদেশের উৎপত্তি ও বিকাশ, সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৮
৩. আখতার ফারুক : বাঙালির ইতিকথা, জুলকারনাইন পাবলিকেশন্স, লক্ষ্মীবাজার ঢাকা, এপ্রিল ১৯৭৬
৪. গঙ্গাঋদ্ধি, উয়ারী-বটেশ্বর, মুক্তবিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া
৫. মেগাস্থিনিস : Ta Indika (তরজমা : শ্রীরজনীকান্ত গুহ), বৈশাখ ১৩১৮
৬. ইবনে বতুতার সফরনামা, তরজমা : মোহাম্মদ নাসির আলী, ধ্রুপদ সাহিত্যাঙ্গন, বাংলাবাজার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪
৭. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস প্রথম খণ্ড (তরজমা : মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান), বাংলা একাডেমি ঢাকা, জুন ২০০৮
৮. বাংলাদেশ : মনসুর মুসা সম্পাদিত, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০৪
৯. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : বাংলা ও বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, ২০০৪
১০. এএফএম আব্দুল জলীল : সুন্দরবনের ইতিহাস, আহমদ পাবলিশিং হাউস, বাংলাবাজার ঢাকা, জুন ২০০২
১১. সিরাজ উদদীন আহমেদ : বরিশাল বিভাগের ইতিহাস, ভাস্কর প্রকাশনী, জুলাই ২০০৩
১২. কাবেদুল ইসলাম : প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতিগোষ্ঠী, উত্তরণ, বাংলাবাজার, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৪
১৩. শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার : বাংলাদেশের ইতিহাস, চতুর্থ সংস্করণ, শ্রাবণ ১৩৭৩, কলকাতা
১৪. অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী : বাংলার মূল, আধুনিক প্রকাশনী, বাংলাবাজার ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৫
১৫. মুয়ায্যম হুসায়ন খান : সোনারগাঁও, বাংলাপিডিয়া
১৬. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস আদি পর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, অষ্টম সংস্করণ : বৈশাখ ১৪২০
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

