আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খিলজি-পূর্ব আমলে বিক্রমপুরের প্রাচীনতম মসজিদের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

রণবীর চক্রবর্তী

খিলজি-পূর্ব আমলে বিক্রমপুরের প্রাচীনতম মসজিদের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

আল্লাভট্টারকস্বামীজনসিতবিহার। এটি একটি একক শব্দ, একটি সংস্কৃত যৌগ। ‘আল্লা’ শব্দটি স্পষ্টতই ‘আল্লাহ’র সংস্কৃতীকরণ। ‘ভট্টারক’ এবং ‘স্বামী’ দুটি সংস্কৃত সম্মানসূচক শব্দ আল্লার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যার অর্থ শ্রদ্ধা।

এই শব্দটি বাংলাদেশে প্রাপ্ত সাত লাইনের একটি শিলালিপিতে পাওয়া যায়, যা বর্মণ রাজবংশের রাজা ভোজবর্মণের (আনুমানিক ১১৩৭-১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) রাজত্বকালের শিলালিপি হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। রাজা ভোজবর্মণ তৎকালীন বঙ্গে, বর্তমান ঢাকা-বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চল রাজত্ব করেছিলেন। বিক্রমপুর ছিল তার রাজধানী। এই শিলালিপি বাংলায় একটি ইসলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাচীনতম প্রমাণ, যা ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি বিজয়ের অনেক আগে এই অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের ইঙ্গিত দেয়।

বিজ্ঞাপন

১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের, বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ উপজেলার সুজানগরে আবিষ্কৃত এই বিশেষ শিলালিপিটি ঢাকার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে রাখা আছে। শিলালিপিটি প্রথম ২০১০ সালে মরহুম শরিফুল ইসলাম অনুবাদ করেছিলেন। পরে, ২০১৯ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন বাংলা এবং বাংলার শিলালিপি বিশেষজ্ঞ রিওসুকে ফুরুই একটি নতুন পাঠ ও উন্নত অনুবাদ প্রদান করেন। রাজত্বের সপ্তম বছরে, ১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দে, ভোজবর্মণ এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কড়ি আকারে আর্থিক অনুদান অনুমোদন করেছিলেন। ‘আল্লাহ’ বা ‘আল্লাহভট্টারকস্বামী’ শব্দটি সম্ভবত একটি মসজিদ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কাঠামোকে বোঝায়, যার মধ্যে ফুরুইয়ের মতে একটি মাদরাসাজাতীয় প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শিলালিপিতে বলা হয়েছে, এই পৃষ্ঠপোষকতার উদ্যোগটি ভোজবর্মণের অধস্তন এবং মধ্যস্থতাকারী শাসক বা মহাসামন্ত অভুদেবের কাছ থেকে এসেছিল, যিনি হাসির পুত্র (সুত) ছিলেন। ‘অভু’ নামটি আরবি ‘আবু’-র সংস্কৃত রূপ। তিনি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, এবং তার নামের সঙ্গে ‘দেব’-এর প্রত্যয় যুক্ত করা হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘দেবতা’। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত একটি সম্মানসূচক শব্দ।

সংস্কৃত ভাষায় ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থের ওপর নির্ভরতা এমন ধারণা তৈরি করে যে, আদি ভারতকে বেদ, ধর্মশাস্ত্র এবং পুরাণের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়; অর্থাৎ শ্রুতি, স্মৃতি ও ঐতিহ্য। কিন্তু এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক নয়। তবু এই সময়কালের খোদাই করা নথির একটি চিত্তাকর্ষক সংগ্রহ রয়েছে, যার বেশির ভাগই পাথর ও তামার প্লেটে খোদাই করা হয়েছে, কখনো কখনো মাটির পাত্রে। প্রায় চার দশক আগে, ভারতীয় লিপিবিদ্যার হবেষক ডিসি সরকার ৮৪,০০০-এরও বেশি খোদাই করা নথি গণনা করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজকীয় এবং প্রশাসনিক রেকর্ড, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দানের নথি এবং ঐশ্বরিক চিত্রের সঙ্গে যুক্ত শিলালিপি। যেহেতু এই শিলালিপিগুলো বেশির ভাগ ঘটনা লিপিবদ্ধ করে, তাই এগুলো বর্ণনামূলক প্রমাণ হিসেবে মূল্যবান। তুলনায়, ধর্মশাস্ত্রগুলো মূলত নির্দেশমূলক।

শিলালিপিগুলোয় অতীতের এমন কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে, যা শিক্ষামূলক লেখাগুলোয় সাধারণত শোনা যায় না। এই শিলালিপিগুলো লেখার চেয়ে তারিখ ও উৎপত্তির দিক থেকে আরো নির্ভুল এবং দূরবর্তী সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি ধারণ করার ক্ষেত্রেও অসীম মূল্যবান। ইতিহাসের অন্যান্য শাখার মতো, শিলালিপিও একটি বিশেষজ্ঞতার কাজ। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের দ্বারা একই লেখার একাধিক পাঠের জন্য এগুলো উন্মুক্ত থাকে।

ভোজবর্মণের নাম তার অন্যান্য শিলালিপি থেকেও জানা যায়, যা তার পঞ্চম রাজত্বকালের তাম্রলিপিতে লেখা একটি ভূমিদানের রেকর্ডে লিপিবদ্ধ। এটি দেখায়, তার দুই পূর্বসূরি হরিবর্মণ এবং সামলবর্মণের মতো তিনিও একজন ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন স্থানীয় রাজা, যিনি প্রাচীন বাংলার একটি উপ-অঞ্চলে শাসন করতেন।

তবু তার রাজ্যে ধর্মবিশ্বাসের বৈচিত্র্যকে স্থান দিয়ে তিনি সাংস্কৃতিক ইতিহাসে খ্যাতি অর্জন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, বৈষ্ণব বর্মণ শাসকদের রাজত্বকালে দুটি বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল।

বর্মণদের অধীনে বঙ্গে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ছিল একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা। বৌদ্ধধর্মের বর্মণ রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতা বিহারের সঙ্গে তাদের পরিচয় নির্দেশ করে। এ কারণেই দ্বাদশ শতাব্দীর শিলালিপিতে একটি ইসলামি প্রতিষ্ঠানকে ‘বিহার’ বলা হয়েছিল

আরবি এবং ফারসি লিপি

আল্লাভট্টরকস্বামীর বিহারে অভুদেবের আর্থিক দানের ক্ষেত্রে এলাকার অ-স্থানীয় জনগণের সব আত্মীয়স্বজনের সম্মতি ছিল। আল্লাভট্টরকস্বামীর উপাসক হিসেবে তারা সম্ভবত বিদেশি মুসলিম ছিলেন। আরবি ও ফারসি গ্রন্থে বহুবার সমন্দর বন্দরের কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলার প্রাচীনতম ইসলামি মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা প্রাচীন বঙ্গে অবাঙালি মুসলিম উপস্থিতি প্রমাণ করে। এই অবাঙালি মুসলিমদের আশ্রয়স্থল ছিল বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে পরিচিত এবং বৌদ্ধ রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত একটি আবাসিক সমাজ। ১২ শতাব্দীর উপকূলীয় বাংলায় আল্লাহর উপাসকদের আবির্ভাব স্পষ্টতই বিজয়ের মাধ্যমে নয়; বরং বাণিজ্যের মাধ্যমে হয়েছিল। ফুরুইয়ের এই আকর্ষণীয় দলিলের অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ পাঠন্মোচন উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক বহুত্বের ঐতিহ্যকে আরো প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি কেরালার একটি শিলালিপিতে চেরা রাজা কুলশেখর কর্তৃক সিরিয়ার একটি খ্রিষ্টান গির্জাকে একই রকম জমি অনুদানের কথা পাওয়া যায়। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কেরালায় একটি ইহুদি বসতি একইভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। কাঠিয়াওয়াড়ের উপকূলীয় শহর সোমনাথ সম্ভবত সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের সবচেয়ে প্রতীকী চিত্র তুলে ধরে। ১২৬৪ সালে একটি বিস্তৃত সংস্কৃত শিলালিপি (আরবিতে সংযোজিত, কিন্তু সংক্ষিপ্ত) বলে যে, সোমনাথে একটি মসজিদ (মিজিগিতি, মসজিদের সংস্কৃত রূপ) একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম জাহাজ মালিক (নাখুদা) নূর-উদ্দিন ফিরুজ (সংস্কৃত ভাষায় নোরাদিনা পিরোজা) দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। যিনি হরমুজ বা পারস্য অঞ্চল থেকে এসেছিলেন।

মসজিদের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি স্থানীয় নগর পরিষদের সভাপতিত্বে শৈব পশুপতি আচার্য কর্তৃক বহাল রাখা হয়েছিল। প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল এবং অবশেষে চালুক্য শাসক বাঘেল অর্জুনদেব কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল। শিলালিপিটি আল্লাহর প্রতি অভিবাদন (ওম নমোস্তুতে) দিয়ে শুরু হয়। আল্লাহকে চারটি অত্যাশ্চর্য গুণ দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে : বিশ্বরূপ (সর্বজনীন), বিশ্বনাথ (বিশ্বের প্রভু), সূর্যরূপ (নিরাকার) এবং লক্ষ্য তবু অলক্ষ্য (দৃশ্যমান কিন্তু অদৃশ্য)।

এই শিলালিপিগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, উপমহাদেশের স্থানীয় সমাজ মুসলিমসহ কোনো প্রবাসী গোষ্ঠীকে আলাদা করার চেষ্টা খুব কমই করেছিল। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ‘গলিয়ে ফেলার পাত্রে’ পরিণত করার কোনো বাধ্যবাধকতাও ছিল না। এটি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে প্রচারের দীর্ঘস্থায়ী ভারতীয় অনুশীলনকে তুলে ধরে। এ কারণেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, ঘৃণার আদর্শ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির বর্তমান সমর্থকদের দ্বারা এই ঐতিহ্য মুছে ফেলার প্রচেষ্টা দেখে কেউ আতঙ্কিত না হয়ে থাকতে পারে না। দ্বাদশ শতাব্দীর বিক্রমপুরে ভোজবর্মণ, যা অনুশীলন করেছিলেন, তা ভারতের সাংস্কৃতিক ধারণাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গ্রহণ করা এবং বহুগুণে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

লেখক : সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ভিজিটিং স্কলার

দ্য হিন্দু থেকে বাংলা : নাহিয়ান মুহাম্মাদ রুমি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...