সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

লঘুচাপে সারাদেশে ভারি বৃষ্টি, বাড়ছে বেশিরভাগ নদীর পানি

লঘুচাপে সারাদেশে ভারি বৃষ্টি, বাড়ছে বেশিরভাগ নদীর পানি

বেশ কয়েকদিনের তাপপ্রবাহের পর স্বস্তি নিয়ে এসেছে বৃষ্টি। সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সারাদেশেই ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা আগামী ২৪ জুন নাগাদ চলতে পারে। ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির প্রভাবে দেশের প্রধান নদনদীর পানি ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। লঘুচাপের বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এরফলেই আবহাওয়ার এমন অবস্থা চলছে।

আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা বলেন, মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের আট বিভাগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা ২৪ কিংবা ২৫জুন নাগাদ চলতে পারে। অতি ভারী বৃষ্টির ফলে পাঁচ জেলায় ভূমিধস এবং রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, আজ মঙ্গলবার সারাদেশেই কমবেশি বৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে কক্সবাজারের সীতাকুন্ডে সবচেয়ে বেশি ১১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এদিন রাজধানী বৃষ্টি রেকর্ড হয় ৩৮ মিলিমিটার।

আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় বিকাল নাগাদ রাজধানীর মিরপুর, কাজীপাড়া, পল্লবী, উত্তরা, পুরানঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হালকা জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। টানা বৃষ্টির কারণে বিকালে অফিস ফেরত কর্মজীবী এবং পথচারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসময় অনেককে ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তায় চলতে দেখা দেয়। সন্ধ্যার দিকে কারওয়ানবাজার, বাংলামোটর, বিজয়স্মরণীসহ বিভিন্ন রাস্তায় যানজটের কারণেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় মানুষকে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছার দেওয়া ভারী বৃষ্টির সতর্কতায় আবহাওয়া অফিস জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয়তার কারণে আজ দুপুর ২টা থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (৮৮ মিলিমিটারের বেশি) বর্ষণ হতে পারে।

এছাড়া অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবন ও কক্সবাজার জেলাগুলোর পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধ্বসের সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে ভারী বর্ষণজনিত কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বলছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয়, উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় তৈরি হচ্ছে বজ্রমেঘ। বিরাজ করছে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিসহ দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

এরই মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দর সমূহকে ৩ (তিন) নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত আবহাওয়ার সতর্কবার্তায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এছাড়া, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

দেশের নদীবন্দরগুলোর জন্য দেয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ কিংবা দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি কিংবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরসমূহকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি সমতল বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারি থেকে অতি-ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে আরো বৃদ্ধি পেয়ে পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে।

এদিকে বেসরকারি বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন গবেষণা টিম (বিডব্লিউওটি) জানিয়েছে, মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘রিমঝিম’সারাদেশে ভারী বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। এটি এমন পূর্ণাঙ্গ বৃষ্টি বলয়, যা দেশের সকল এলাকায় যথেষ্ট বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এই বৃষ্টি বলয়ে দেশের শতভাগ এলাকা কমবেশি আক্রান্ত হতে পারে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি দেশের প্রায় সব অঞ্চলে যথেষ্ট বৃষ্টি ঝরাবে, তবে কিছু এলাকায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ‘রিমঝিম, নামে পূর্ণাঙ্গ মৌসুমি বৃষ্টিবলয়টি দেশের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে প্রায় সব বিভাগেই সক্রিয় থাকবে। রিমঝিমের প্রভাবে যথেষ্ট পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঝরাবে।

এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। এছাড়া রংপুর, বরিশাল, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগেও ‘রিমঝিম’ সক্রিয় থাকবে। খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে এর প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম হলেও বৃষ্টি ঝরাবে।

বিডব্লিউওটি সতর্ক করেছে, রিমঝিমের প্রভাবের ফলে রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের নিচু এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। যদিও বড় কোনো আশঙ্কা নেই, তবে কোথাও কোথাও বজ্রপাত হতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সাগর কিছুটা উত্তাল থাকতে পারে মৌসুমি বায়ুর তারতম্যের কারণে।

‘রিমঝিম’চলতি বছরের দ্বিতীয় মৌসুমি বৃষ্টিবলয়। এটি ১৬ জুন দেশের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে প্রবেশ করেছে এবং ২৮ জুনের মধ্যে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল হয়ে দেশের উপরিভাগ ত্যাগ করতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।

শক্তিশালী মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘রিমঝিম’দেশের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আনতে চলেছে। এর প্রভাবে এরইমধ্যে তাপপ্রবাহ প্রশমিত হলেও বেশ কিছু এলাকায় বন্যার আশঙ্কা থাকায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পাশাপাশি দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতও আনতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র

সংস্থাটি পূর্বাভাসে বলছে, চট্টগ্রাম বিভাগের মুহরি, হালদা ও গোমতী নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীসমূহের অববাহিকায়েএক দিন মাঝারি-ভারি থেকে ভারি এবং ২য় ও ৩য় দিন ভারি থেকে অতি-ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। নদীসমূহের পানি সমতল আগামী ৩ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে; আগামী ৭২ ঘন্টায় ফেনী জেলার মুহরি নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে।

সিলেট বিভাগের সারিগোয়াইন নদীর পানিসমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখনো বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই অববাহিকায় আগামী এক দিন মাঝারি থেকে ভারি এবং ২য় ও ৩য় দিন মাঝারি-ভারি থেকে অতি-ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উক্ত নদীর পানি সমতল আগামী ৩ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় সিলেট জলার সারিগোয়াইন নদী, সুনামগঞ্জ জেলার যাদুকাটা নদী ও নেত্রকোণা জেলার সোমেশ্বরী নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে।

সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে; নদীসমূহের পানি সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে; তবে বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এই অববাহিকায় আগামী ০১ দিন পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারি এবং ২য় ও ৩য় দিন মাঝারি-ভারি থেকে অতি-ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।।

তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে তবে বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা আগামী ০২ দিন পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে, ৩য় দিন বৃদ্ধি পেতে পারে।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে। নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস আগামী ০১ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে, ২য় ও ৩য় দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে ও তৎপরবর্তী ০২ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে; তবে বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।

গঙ্গা-পদ্মা নদীসমূহের পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। নদীসমূহের পানি সমতল আগামী ০৫ দিন পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে; এবং বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন