বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ১৩ জেলায় আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস

বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ১৩ জেলায় আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস
ফাইল ছবি

আকাশের মেঘ ভাঙা কান্না আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের ১৩ জেলায় ঘনিয়ে আসছে আকস্মিক বন্যার কালো ছায়া। প্রকৃতি যেন পুনরায় তার রুদ্র রূপ ধারণ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপদকে ভাসিয়ে দিতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের রোববারের সতর্কবার্তায় নদীপাড়ের মানুষের বুকে জাগিয়েছে এক অজানা আতঙ্ক।

প্রকৃতির এই আকস্মিক রোষে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্লাবিত হতে পারে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। নদীসংলগ্ন জনপদগুলো এখন প্রহর গুনছে—কখন জানি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে শয়ন ঘরে।

বিজ্ঞাপন

ইতোমধ্যেই সুরমা-কুশিয়ারার অববাহিকায় নদীর পানি উথাল-পাথাল নৃত্য শুরু হয়ে গেছে। কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ ও মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্লাবিত করছে তীরবর্তী লোকালয়। আগামী ৭২ ঘণ্টায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের সুরমা-কুশিয়ারা সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে এই প্লাবনের ক্ষত আরও গভীর হতে পারে, কিংবা স্থবির হয়ে পড়তে পারে জনজীবন।

উত্তরের তিস্তা, ধরলা আর দুধকুমারও ফুঁসে উঠছে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। পিছিয়ে নেই নেত্রকোণার সোমেশ্বরী নদীও; আগামী তিন দিনে তার বিপৎসীমা পেরিয়ে নিম্নাঞ্চলকে ভাসিয়ে দেওয়ার চঞ্চলতায় মত্ত।

অন্যদিকে, ২০ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বুক চিরে ধেয়ে আসা প্লাবন কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের কিছু স্থানে সতর্কসীমা ছুঁয়ে যাবে, যার ফলে নদীমাতৃক এই অঞ্চলের বুক চিরে জেগে ওঠা চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হওয়ার প্রহর গুনছে।

গত সপ্তাহের টানা বর্ষণের পর প্রকৃতিতে যে ক্ষণিকের বিরতি মিলেছিল, তা যেন ছিল এক ঝড়ের পূর্বাভাস। আবহাওয়াবিদ আব্দুল হামিদ জানিয়েছেন, সোমবার থেকেই দেশের তিনটি বিভাগে শুরু হতে পারে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির তাণ্ডব, যা পরবর্তী কয়েকদিন ধরে সমগ্র দেশের ওপর তার আধিপত্য বজায় রাখবে।

আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবিরের স্বাক্ষরিত ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর ডানায় ভর করে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে আকাশের বুক চিরে নামবে ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার কিংবা তারও বেশি বৃষ্টিপাতের ধারা।

প্রকৃতির এই বৃষ্টিধারার তীব্রতা ইতোমধ্যেই টের পেয়েছে উত্তরের সীমান্ত ঘেঁষা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া, যেখানে রোববার সর্বোচ্চ ১৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নীলফামারীর ডিমলা, নোয়াখালীর হাতিয়া, কিংবা সাগরের কোল ঘেঁষে থাকা কক্সবাজার ও টেকনাফ—সবখানেই মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির নূপুরধ্বনি বয়ে এনেছে প্লাবনের বার্তা।

এদিন নীলফামারীর ডিমলায় ৬৩ মিলিমিটার, নোয়াখালীর হাতিয়ায় ১১০, কক্সবাজারে ৭৫, টেকনাফে ৬২, কুমিল্লায় ৫৫, খুলনায় ও সন্দ্বীপে ৪৭ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

রাজধানীতে যদিও মাত্র ৫ মিলিমিটারের মৃদু স্পর্শ লেগেছে, কিন্তু আবহাওয়া অফিস জানাচ্ছে, ঢাকাও পার পাবে না এই মেঘের খেলা থেকে। রাজশাহীতে রোববার যেখানে ৩৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল, সেখানে মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তায় আগামী দিনগুলোতে দেশের আটটি বিভাগেই দমকা হাওয়া আর বজ্রবিদ্যুতের আলোড়নে মুখরিত হবে আকাশ।

একই সাথে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় নদীগুলোতে সাগরের উত্তাল জোয়ারের জল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতায় আছড়ে পড়ছে। বৃষ্টি আর মেঘের এই বৈরী মিতালী দেশের ১৩টি জেলার মানুষকে এক অনিশ্চিত ও স্বল্পমেয়াদি বন্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে যাপিত জীবন আর প্রকৃতির লড়াই এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন